রোমান ব্রিটেনে প্রাচীন মিশরীয় নাগরিকের সন্ধান? ইয়র্কের এক রহস্যময় সুরমাদানি (Kohl Bottle) ও প্রাচীন ইতিহাসের অজানা অধ্যায়
আমরা যখনই ‘প্রাচীন মিশর’ শব্দবন্ধটি শুনি, আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বিশাল সব পিরামিড, মমি, ফারাওদের রাজকীয় জীবন এবং তাদের চমৎকার সাজগোজ। বিশেষ করে প্রাচীন মিশরীয় নারী ও পুরুষদের চোখের সেই গাঢ় কালো আইলাইনার বা কাজল, যা ইতিহাস ও পপ-কালচারে অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রাচীন বিশ্বে এই বিশেষ কাজলকে বলা হতো ‘কোল’ (Kohl)। এই কোল বা সুরমা রাখার জন্য তারা এক ধরনের বিশেষ ছোট পাত্র বা বোতল ব্যবহার করত, যাকে বলা হতো ‘কোল পট’ বা সুরমাদানি (Kohl Bottle)।
সাধারণত এই সুরমাদানিগুলো (Kohl Bottle) মিশর এবং তার আশেপাশের সুদান (প্রাচীন নুবিয়া) অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে ইংল্যান্ডের ইয়র্ক (York) শহরে মাটির নিচে এমন একটি পাত্র পাওয়া যায়, যা পুরো ইতিহাসবিদ সমাজকে চমকে দিয়েছে। রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা প্রাচীন ব্রিটেনে কীভাবে পৌঁছাল এই খাঁটি মিশরীয় সুরমাদানি (Kohl Bottle)? তবে কি রোমান সেনাবাহিনীতে কোনো মিশরীয় নাগরিক ছিলেন, যিনি হাজার মাইল দূরে এসেও নিজের দেশের সংস্কৃতি ভুলে যাননি?
আসুন, অত্যন্ত সহজ ভাষায় বিশদভাবে জেনে নিই প্রত্নতত্ত্বের এই রোমাঞ্চকর আবিষ্কার এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা এক প্রাচীন মানব ইতিহাসের গল্প।
১. আবিষ্কারের পটভূমি: ১৯৮০-এর দশকের সেই সাধারণ খননকাজ
গল্পের শুরু ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে। যুক্তরাজ্যের উত্তর ইয়র্কশায়ারের ঐতিহাসিক শহর ইয়র্কের ‘ট্যানার রো’ (Tanner Row) নামক এলাকায় ইয়র্ক আর্কিওলজিক্যাল ট্রাস্ট (York Archaeological Trust) একটি সাধারণ খননকাজ চালাচ্ছিল। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রাচীন রোমান যুগের একটি আবর্জনার স্তূপ বা ‘রুবীশ ডাম্প‘-এর সন্ধান পান।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেন, এই আবর্জনার স্তূপটি আজ থেকে প্রায় ১৮০০ বছর আগের, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের শেষের দিকের (Late 2nd Century AD)। সেই সময় এই এলাকাটি রোমান সাম্রাজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেনাঘাঁটি বা ‘লিজিয়ন ফোর্টেস’ (Legionary Fortress)-এর ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থিত ছিল।
খননকাজের সময় অন্যান্য সাধারণ রোমান যুগের ভাঙা কাঁচের টুকরো, মাটির পাত্রের সাথে একটি ছোট্ট, অদ্ভুত দেখতে কাঁচের বোতল বা ফ্লাস্ক পাওয়া যায়। পাত্রটি তখন দেখতে বেশ সাধারণ এবং অপরিচ্ছন্ন ছিল। যেহেতু প্রতিদিন শত শত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধার করা হয়, তাই এই বোতলটিকে সাধারণ একটি রোমান কাঁচের পাত্র মনে করে ল্যাবরেটরির আর্কাইভে বা বাক্সে বন্দি করে রেখে দেওয়া হয়। কেউ তখন ভাবতেও পারেনি, এই সাধারণ বোতলটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক বিশাল ঐতিহাসিক রহস্য।
২. চার দশক পর ড. হিলারি কুলের চমকপ্রদ আবিস্কার
দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে বোতলটি আর্কাইভে ধুলো জমছিল। কিন্তু ইতিহাসের সত্য কখনো না কখনো সামনে আসেই। বার্বিকান রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটস (Barbican Research Associates)-এর প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক এবং কাঁচ বিশেষজ্ঞ ড. হিলারি কুল (Dr. Hillary Cool) যখন তাঁর ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভগুলো গুছিয়ে রাখছিলেন এবং পুনর্মূল্যায়ন করছিলেন, তখন তাঁর চোখ পড়ে এই ছোট্ট নীলচে-সবুজ বোতলটির ওপর।
ড. কুল প্রাচীন রোমান কাঁচের পাত্রের ওপর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি বোতলটি হাতে নিয়েই বুঝতে পারেন, এটি রোমান ব্রিটেনের সাধারণ কোনো কাঁচের পাত্র নয়। এর গঠন, এর কাঁচের পুরুত্ব এবং ভেতরের শূন্যস্থানটি রোমান ঘরানার সাথে একেবারেই মিলছে না।
তিনি যখন মিশরে পাওয়া প্রাচীন কাঁচের পাত্রের নকশার সাথে এটি মেলালেন, তখন তিনি চমকে উঠলেন। এটি আর কিছুই নয়, এটি ছিল একটি নিখুঁত প্রাচীন মিশরীয় সুরমাদানি বা ‘কোল বোতল (Kohl Bottle)’। ড. কুলের এই আবিষ্কারের পর এটিই প্রমাণিত হলো যে, সমগ্র রোমান ব্রিটেনে উদ্ধার হওয়া এটিই প্রথম এবং একমাত্র মিশরীয় কোল বোতল।

৩. বোতলটির গঠন: কেন এটি অনন্য ও রহস্যময়?
ড. হিলারি কুল কেন এই বোতলটিকে সাধারণ রোমান বোতল থেকে আলাদা করলেন, তা বুঝতে হলে আমাদের এর গঠন এবং বৈশিষ্ট্যগুলো বিস্তারিতভাবে জানতে হবে।
ক) কাঁচের রঙ ও অবক্ষয় (Weathering Patches)
সাধারণত ব্রিটেনে যে সমস্ত রোমান কাঁচের পাত্র পাওয়া যায়, সেগুলোর রঙ মাটির নিচে থাকার ফলে এক ধরনের স্বাভাবিক পরিবর্তন বা কালারেশন দেখায়। কিন্তু ইয়র্কের এই বোতলটি ছিল গাঢ় নীলচে-সবুজ (Blue-green)। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, এর ওপর একটি অত্যন্ত পুরু, রুপালি রঙের চকচকে আস্তরণ (Silvery Iridescence) এবং কালচে রঙের দাগ ছিল। মাটি বা আবহাওয়ার কারণে এই পরিবর্তন হয়নি, কারণ একই স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া অন্যান্য রোমান কাঁচের টুকরোতে এমন রূপালি আস্তরণ দেখা যায়নি। এটি নির্দেশ করে যে, এই বোতলটি তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচের উপাদানই ছিল ভিন্ন এবং তা ব্রিটেনের বাইরে থেকে এসেছিল।
খ) অদক্ষতার অভাব নাকি বিশেষ কারিগরি?
ড. কুল প্রথমে ভেবেছিলেন, এটি হয়তো কোনো রোমান কারিগরের ভুল বা অদক্ষতার কারণে বিচিত্র আকৃতির তৈরি হয়েছে। কিন্তু তিনি নিজেই মন্তব্য করেছেন:
“আমি আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে রোমান কাঁচের পাত্র তৈরিতে এই স্তরের অদক্ষতা বা ভুল কখনো দেখিনি।”
অর্থাৎ, বোতলটি ভুল করে এমন তৈরি হয়নি, বরং এটিকে অত্যন্ত সচেতনভাবে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এই রূপ দেওয়া হয়েছিল।
গ) নলাকার ভেতরের অংশ (Cylindrical Internal Hollow)
সাধারণ রোমান বোতলের দেয়াল বা কাঁচের স্তর খুব পাতলা হতো। বোতলটির বাইরে থেকে যেমন আকৃতি দেখা যেত, ভেতরের ফাঁপা অংশটিও ঠিক তেমনই হতো। কিন্তু ইয়র্কের এই বোতলটির কাঁচের দেয়াল ছিল অত্যন্ত পুরু এবং ভারী। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, এর বাইরের দিকটা একটু চওড়া হলেও এর ভেতরের ফাঁপা অংশটি ছিল একদম সোজা এবং নলাকার (Cylindrical)।
এই বিশেষ নকশাটি প্রাচীন মিশরে তৈরি কোল বোতলের সিগনেচার ডিজাইন। কারণ, কাজল বা সুরমা একটি তরল বা আঠালো পাউডার জাতীয় পদার্থ। বোতলের ভেতরের অংশ যদি সোজা নলাকার হয়, তবে একটি চিকন কাঠি বা অ্যাপ্লিকেটর স্টিক (Applicator Stick) ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ালের গা থেকে সহজেই সবটুকু কাজল বা সুরমা চেঁছে তুলে আনা যায়।
৪. প্রাচীন মিশরের কাঁচ শিল্প ও সুরমাদানির (Kohl Bottle) ব্যবহার
খ্রিস্টীয় প্রথম এবং দ্বিতীয় শতকে প্রাচীন মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া এবং তার আশেপাশের অঞ্চলের কাঁচ নির্মাতারা বিশ্ববিখ্যাত ছিলেন। তারা মূলত দুই ধরনের কাঁচের বোতল তৈরি করতেন:
১. যার ভেতরের এবং বাইরের আকৃতি একই রকম (সাধারণ ব্যবহারের জন্য)।
২. যার ভেতরের অংশটি নলাকার ও সরু (বিশেষ করে সুরমা রাখার জন্য)।
মিশরের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো পর্যবেক্ষণ করলে এই সুরমাদানির (Kohl Bottle) সত্যতা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। মিশরের বিভিন্ন প্রাচীন রোমান সেনা ছাউনি, যেমন—উম্ম বালাদ (Umm Balad) যা দ্বিতীয় শতকের, এবং দিদিমোই (Didymoi) যা ৯০ খ্রিস্টাব্দের, সেখানে এই একই ধরনের বোতল পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে মিশরের ফোর্ট ওয়াদি আবু মা’আমেল (Fort Wadi Abu Ma’amel) নামক একটি প্রাচীন দুর্গের আবর্জনার স্তূপে। সেখান থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা একসাথে ৩৬টি এই একই ধরনের কোল বা সুরমা রাখার পাত্র উদ্ধার করেছিলেন। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মিশরে অবস্থানরত মানুষদের কাছে এটি অত্যন্ত সাধারণ এবং নিত্যব্যবহার্য জিনিস ছিল। কিন্তু মিশরের বাইরে এর কোনো ব্যাপক উপস্থিতি ছিল না।
৫. বাণিজ্য নাকি ব্যক্তিগত আবেগ? তিনটি সম্ভাবনা বাতিল
ড. হিলারি কুল এই বোতলটি ব্রিটেনে আসার পেছনে কয়েকটি প্রচলিত তত্ত্ব বা সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেন এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তির মাধ্যমে সেগুলো বাতিল করেন:
প্রথম সম্ভাবনা: এটি কি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অংশ ছিল?
যদি মিশরের ব্যবসায়ীরা ব্রিটেনে এই বোতল রপ্তানি করত, তবে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরের বাজারে, ধনী পরিবারগুলোর সমাধিতে বা অন্যান্য রোমান ঘাঁটিতে এই বোতল আরও অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া যেত। যেহেতু পুরো ব্রিটেনে মাত্র একটিই বোতল পাওয়া গেছে, তাই এটি কোনো বাণিজ্যিক পণ্য বা নিয়মিত আমদানির অংশ হতে পারে না।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা: এটি কি কোনো সুগন্ধি বা পারফিউমের বোতল ছিল?
রোমান সাম্রাজ্যে সুগন্ধি তেলের ব্যাপক ব্যবসা ছিল। কিন্তু এই বোতলটির ভেতরের আয়তন ছিল অত্যন্ত কম। সুগন্ধি রাখার জন্য রোমানদের নিজস্ব চমৎকার এবং পাতলা কাঁচের পাত্র ছিল। এত ভারী এবং কম জায়গা যুক্ত বোতলে কেউ দূর দেশ থেকে সুগন্ধি পরিবহন করত না।
তৃতীয় সম্ভাবনা: এটি কি কোনো পর্যটকের আনা স্মারক (Souvenir)?
অনেক সময় মানুষ বিদেশে ঘুরতে গেলে সেখান থেকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে স্থানীয় জিনিসপত্র কিনে আনে। কিন্তু ড. কুলের মতে, যদি রোমান পর্যটকরা মিশর ভ্রমণে গিয়ে শখ করে কাজল বা সুরমাদানি (Kohl Bottle) কিনে আনত, তবে ব্রিটেনের সমৃদ্ধ এলাকায় এমন বোতল আরও প্রায়ই দেখা যেত। তাছাড়া, সে যুগে সাধারণ মানুষের পক্ষে এত দূর ভ্রমণ করাও বেশ কঠিন ছিল।
এই সমস্ত সম্ভাবনা বাতিল করার পর ড. কুল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, এই আবিষ্কারটির একটি গভীর নৃতাত্ত্বিক বা জাতিগত তাৎপর্য (Ethnographic Implications) রয়েছে। অর্থাৎ, এই বোতলটি কোনো সখের বস্তু নয়, এটি এমন একজন মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল যার জীবনে এই কাজলের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং প্রতিদিনের অভ্যাসের অংশ।
৬. রোমান ব্রিটেনের সাথে মিশরের গোপন সংযোগ
১৮০০ বছর আগে ব্রিটেনের মতো একটি দূরবর্তী দ্বীপের সাথে মিশরের সম্পর্ক কেমন ছিল, তা ভাবলে আমাদের অবাক হতে হয়। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকার কারণে এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির দেশের মধ্যে কিছু বিশেষ সংযোগ তৈরি হয়েছিল। ইয়র্কের এই সুরমাদানিটি একা নয়, এর পক্ষে সমর্থন জোগায় এমন আরও কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নিচে আলোচনা করা হলো:
[মিশরীয় সংস্কৃতি ও দেবতা] ───► [রোমান সেনাবাহিনীর মাধ্যমে স্থানান্তর] ───► [প্রাচীন ব্রিটেন (ইয়র্ক ও লেস্টার)]
ক) দেবতা সেরাপিসের মন্দির (Temple of Serapis)
ইয়র্ক শহরের তৎকালীন রোমান সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কমান্ডিং অফিসার বা লেগেইট ছিলেন ক্লডিয়াস হিয়েরোনিমিয়ানাস (Claudius Hieronymianus)। তিনি ইয়র্ক শহরে একটি বিশাল মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মন্দিরটি উৎসর্গ করা হয়েছিল গ্রীকো-মিশরীয় দেবতা সেরাপিস (Serapis)-এর উদ্দেশ্যে। সেরাপিস ছিলেন সূর্য, নিরাময় এবং পুনর্জন্মের দেবতা, যাঁর উপাসনা মিশরে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। একজন রোমান অফিসারের ব্রিটেনে এসে মিশরীয় দেবতার মন্দির তৈরি করা এটাই প্রমাণ করে যে, সেখানকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর মিশরীয় সংস্কৃতির গভীর প্রভাব ছিল।
খ) লেস্টারের হাতির দাঁতের বাক্স ও আনুবিসের ছবি
ইয়র্ক থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত ব্রিটেনের লেস্টার (Leicester) শহরে প্রত্নতাত্ত্বিকরা হাতির দাঁতের (Ivory) তৈরি একটি চমৎকার প্রাচীন বাক্স খুঁজে পেয়েছেন। এই বাক্সের গায়ে খোদাই করা ছিল প্রাচীন মিশরের মৃত্যু ও মমিকরণের দেবতা আনুবিস (Anubis)-এর ছবি। আনুবিস ছিলেন শৃগাল-মুখী এক দেবতা, যিনি রোমান সেনাবাহিনীতে কর্মরত সৈন্যদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন, বিশেষ করে যারা মিশরে ডিউটি বা দায়িত্ব পালন করে এসেছিলেন।
গ) মিশরীয় মিলিটারি সিল (Military Seals)
লেস্টারের সেই একই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে কিছু সামরিক সিল বা স্ট্যাম্প পাওয়া গেছে। এই সিলগুলোর নথিপত্র পরীক্ষা করে জানা যায়, এগুলো এমন একদল রোমান সৈন্য বা ইউনিটের ছিল, যারা একসময় মিশরে মোতায়েন ছিল এবং পরবর্তীতে তাদের ব্রিটেনে স্থানান্তরিত করা হয়।

৭. আসল রহস্যের উন্মোচন: কে ছিলেন সেই কাজল ব্যবহারকারী?
এই সমস্ত তথ্যপ্রমাণ জোড়া লাগালে ড. হিলারি কুল এবং অন্যান্য ইতিহাসবিদরা একটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত এবং রোমাঞ্চকর সিদ্ধান্তে উপনীত হন। ইয়র্কের এই সুরমাদানিটি কোনো সাধারণ মানুষের ছিল না। এটি ছিল একজন রোমান সৈন্যের (Roman Soldier) ব্যক্তিগত সামগ্রী।
এখানে দুটি প্রধান তত্ত্ব উঠে আসে:
-
তিনি ছিলেন একজন খাঁটি মিশরীয়: রোমান সেনাবাহিনীতে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোক নিয়োগ করা হতো। হতে পারে, মিশরের কোনো তরুণ রোমান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন এবং তাঁর বদলি হয়েছিল দূরবর্তী, ঠাণ্ডা দেশ ব্রিটেনে। তিনি যখন মিশর থেকে যাত্রা করেন, তখন নিজের সংস্কৃতি এবং অভ্যাসের অংশ হিসেবে এই সুরমাদানিটি সাথে নিয়ে এসেছিলেন।
-
তিনি ছিলেন মিশরে দীর্ঘকাল কাটানো রোমান সৈন্য: এমনও হতে পারে যে, সৈন্যটি জন্মসূত্রে ব্রিটিশ বা ইতালীয় ছিলেন, কিন্তু তাঁর সামরিক জীবনের একটি দীর্ঘ সময় কেটেছিল মিশরের তপ্ত মরুভূমিতে। সেখানে থাকতে থাকতে তিনি স্থানীয় মিশরীয়দের মতো চোখে কাজল লাগানোর অভ্যাস রপ্ত করে নেন (যা হয়তো মরুভূমির তীব্র রোদ এবং চোখের ইনফেকশন থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করত)। পরবর্তীতে যখন তাঁর ইউনিটকে ইয়র্কে বদলি করা হয়, তখন তিনি তাঁর এই প্রিয় অভ্যাস এবং সুরমাদানিটি নিজের সাথে করে নিয়ে আসেন।
একদিন কোনো কারণে বোতলটি ভেঙে যায় বা খালি হয়ে যায়, এবং তিনি সেটি সেনানিবাসের সামনের আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেন। আর সেটাই ১৮০০ বছর পর আমাদের সামনে এক নতুন ইতিহাস উন্মোচন করল।
৮. রোমান সৈন্যদের বাহ্যিক রূপ নিয়ে আমাদের ভুল ধারণা
এই আবিষ্কারটি আমাদের সাধারণ ঐতিহাসিক ধারণাকে একটি ধাক্কা দেয়। আমরা যখনই কোনো সিনেমা, নাটক বা বইতে রোমান সৈন্যদের দেখি, আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ধাতব বর্ম পরা, তলোয়ার হাতে, কঠোর চেহারার কিছু পেশীবহুল পুরুষ। আমরা কখনোই ভাবি না যে, একজন রোমান সৈন্য চোখে সুন্দর করে আইলাইনার বা কাজল মেকআপ লাগিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বা ব্যারাকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন!
ড. কুল খুব চমৎকারভাবে বলেছেন:
“দিনের শেষে, চোখে আইলাইনার বা কাজল পরা এমন একটি অভ্যাস যা আমরা সাধারণত রোমান সেনাবাহিনীর সাথে মেলাতে পারি না।”
কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, প্রাচীন পৃথিবীর মানুষরা আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় এবং আধুনিক ছিলেন। পুরুষদের সাজগোজ বা মেকআপ করা প্রাচীন যুগে কোনো অস্বাভাবিক বিষয় ছিল না, বিশেষ করে মিশরীয় সংস্কৃতিতে এটি ছিল অত্যন্ত পবিত্র এবং স্বাস্থ্যকর একটি অভ্যাস।
৯. প্রাচীন যুগে সুরমা বা কোল ব্যবহারের কারণ
শিক্ষার্থীদের বোঝার সুবিধার্থে আমাদের জানা প্রয়োজন যে, প্রাচীন মিশরীয়রা কেন চোখে এই ‘কোল’ বা সুরমা ব্যবহার করত। এটি কি কেবলই সৌন্দর্যের জন্য ছিল, নাকি এর পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ ছিল?
-
সূর্যের আলো থেকে রক্ষা: মিশরের মরুভূমির তীব্র রোদ ও আলোর ঝলকানি (Glare) থেকে চোখকে রক্ষা করার জন্য চোখের চারপাশে এই কালো প্রলেপ দেওয়া হতো। বর্তমান যুগেও ক্রিকেট বা বেসবল খেলোয়াড়দের চোখের নিচে কালো রঙ (Eye Black) লাগাতে দেখা যায়, যা মূলত এই একই বৈজ্ঞানিক কারণে করা হয়।
-
চোখের রোগ প্রতিরোধ: প্রাচীন সুরমা বা কোলে প্রাকৃতিক খনিজ যেমন গ্যালেনা (Lead Sulfide) এবং ম্যালাকাইট ব্যবহৃত হতো। এগুলো চোখে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বা ইনফেকশন ছড়াতে বাধা দিত এবং চোখকে ঠান্ডা রাখত।
-
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস: মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে, চোখে কাজল লাগালে তা মন্দ দৃষ্টি বা ‘Evil Eye’ থেকে রক্ষা করে। তাদের দেবতা হোররাস (Horus) এবং রা (Ra)-এর আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য তারা চোখের মেকআপকে এক ধরনের ধর্মীয় আচার মনে করত।
১০. শিক্ষণীয় দিক এবং ভবিষ্যতের গবেষণা
যদিও ইয়র্কের এই নির্দিষ্ট কাঁচের বোতলটি নিয়ে বর্তমানে আর নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার পরিকল্পনা নেই, তবে এই আবিষ্কারটি বিশ্বজুড়ে রোমান আমলের কাঁচের পাত্র গবেষণার ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রাচীন বোতলগুলোর ভেতরে লেগে থাকা অবশিষ্টাংশ বা ‘রেসিডিউ অ্যানালাইসিস’ (Residue Analysis) করার ওপর জোর দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে জানা সম্ভব হবে যে, সেই পাত্রগুলোতে ঠিক কী ধরনের রাসায়নিক উপাদান বা মেকআপ রাখা হতো।
এই পুরো ঘটনাটি থেকে আমরা মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় জানতে পারি:
১. ইতিহাসের গতিশীলতা: প্রাচীন পৃথিবী আজকের গ্লোবালাইজড বা বিশ্বায়িত পৃথিবীর মতোই একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল। মহাদেশের এক প্রান্তের সংস্কৃতি অন্য প্রান্তে অনায়াসে যাতায়াত করত।
২. সংস্কৃতির স্থায়িত্ব: মানুষ যেখানেই যাক না কেন, সে তার শিকড়, তার প্রতিদিনের অভ্যাস এবং তার সংস্কৃতিকে নিজের সাথে বহন করে নিয়ে যায়। ইয়র্কের সেই বেনামী সৈন্যটি আমাদের সেটাই শিখিয়ে গেলেন।

এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের তালিকা (Quick Reference Table)
নিচের টেবিলটি থেকে আপনারা এই পুরো আর্টিকেলের মূল তথ্যগুলো এক নজরে দেখে নিতে পারবেন, যা পরীক্ষার খাতা বা কুইজের জন্য অত্যন্ত সহায়ক:
| মূল অনুসন্ধানের বিষয় | বিস্তারিত তথ্য ও বিবরণ |
| আবিষ্কৃত বস্তু | প্রাচীন মিশরীয় সুরমাদানি বা কোল বোতল (Kohl Bottle)। |
| আবিষ্কারের স্থান | ট্যানার রো, ইয়র্ক, ইংল্যান্ড (সাবেক রোমান-ব্রিটেন)। |
| আবিষ্কারের সময়কাল | ১৯৮৩-৮৪ সাল (পুনর্মূল্যায়ন করা হয় সাম্প্রতিক সময়ে)। |
| বস্তুটির ঐতিহাসিক সময় | খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের শেষ ভাগ (Late 2nd Century AD)। |
| প্রধান গবেষক | ড. হিলারি কুল (কাঁচ পাত্র বিশেষজ্ঞ)। |
| বোতলের রঙ ও গঠন | নীলচে-সবুজ, রূপালি আস্তরণযুক্ত এবং ভেতরের অংশটি নলাকার ও পুরু। |
| ঐতিহাসিক গুরুত্ব | সমগ্র রোমান ব্রিটেনে পাওয়া প্রথম এবং একমাত্র মিশরীয় সুরমাদানি। |
| সম্ভাব্য ব্যবহারকারী | রোমান সেনাবাহিনীতে কর্মরত একজন মিশরীয় বা মিশর-ফেরত সৈন্য। |
সুরমাদানির (Kohl Bottle) চমকপ্রদ তথ্য
একটি ছোট্ট চার ইঞ্চি কাঁচের বোতল কীভাবে ইতিহাসের একটি বিশাল সত্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরতে পারে, ইয়র্কের এই সুরমাদানি (Kohl Bottle) তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এটি কেবল একটি আবর্জনার স্তূপে পাওয়া কাঁচের টুকরো নয়, এটি হলো এক প্রাচীন মানুষের পরিচয়পত্র, যা প্রমাণ করে যে আজ থেকে ১৮০০ বছর আগেও মানুষ নিজের দেশের স্মৃতি আর অভ্যাসকে বুকে ধরে হাজার মাইল দূরে পাড়ি জমাত। ইতিহাস কেবল যুদ্ধ আর রাজাদের গল্প নয়, ইতিহাস হলো এই সমস্ত সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অভ্যাস আর সংস্কৃতির এক বিশাল ভান্ডার।
এইরকম আরও খবর পড়তে দেখুন বুলেটিন বাংলা