এআই (AI) নজরদারি এড়াতে জার্মান ডিজাইনারের তৈরি ৭৭ ডলারের অভিনব শার্ট: ‘ডিজিটাল ক্যামোফ্লেজ'(Digital Camouflage)
বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমরা যেখানেই যাই না কেন, কোনো না কোনো সিসিটিভি (CCTV) বা নজরদারি ক্যামেরার আওতায় আমাদের থাকতে হয়। রাস্তাঘাট, শপিং মল, অফিস থেকে শুরু করে পার্ক—সব জায়গায় বসানো হচ্ছে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) চালিত ক্যামেরা। এই ক্যামেরাগুলো শুধু ভিডিও রেকর্ড করে না, বরং মানুষের গতিবিধি, আচরণ এবং পরিচিতি শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু কেমন হতো যদি এমন কোনো পোশাক থাকত, যা পরলে এই অত্যাধুনিক এআই ক্যামেরাগুলো আপনাকে দেখতেই পেত না?
শুনতে কল্পবিজ্ঞান বা সাই-ফাই সিনেমার মতো মনে হলেও, বাস্তবে এমনই একটি অভাবনীয় কাজ করে দেখিয়েছেন জার্মান আর্টিস্ট এবং ডিজাইনার সাইমন ওয়েকার্ট (Simon Weckert)। তিনি এমন একটি রঙিন এবং অদ্ভুত প্যাটার্নের শার্ট তৈরি করেছেন, যা এআই-চালিত ক্যামেরা এবং অবজেক্ট-ডিটেকশন (Object-Detection) সিস্টেমকে পুরোপুরি বোকা বানাতে সক্ষম। মাত্র ৭৭ ডলারে তৈরি এই শার্টটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডিজিটাল ক্যামোফ্লেজ’ (Digital Camouflage)।
এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা জানব কীভাবে এই শার্টটি কাজ করে, এর পেছনের প্রযুক্তি কী, এবং কেন সাইমন ওয়েকার্ট এই ধরনের একটি অভিনব পোশাক তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
সাইমন ওয়েকার্ট এবং ‘ডিজিটাল ক্যামোফ্লেজ (Digital Camouflage)’ এর জন্ম
সাইমন ওয়েকার্ট একজন সুপরিচিত জার্মান শিল্পী ও ডিজাইনার, যিনি মূলত প্রযুক্তি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন। আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি (Privacy) নষ্ট করছে, তা নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার।
তার এই নতুন আবিষ্কার, ‘ডিজিটাল ক্যামোফ্লেজ’ মূলত একটি শার্ট, যা উজ্জ্বল রং এবং অদ্ভুত, ওভারল্যাপিং (Overlapping) প্যাটার্ন দিয়ে তৈরি। এই প্যাটার্নগুলো মানুষের চোখের কাছে সাধারণ বা একটু বেশি রঙিন মনে হলেও, একটি কম্পিউটারের চোখ বা লেন্সের কাছে এটি চরম বিভ্রান্তিকর। শার্টটির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে আনুমানিক ৭৭ থেকে ১০০ মার্কিন ডলারের মধ্যে। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া একটি চলমান প্রজেক্টের অংশ হিসেবে এই শার্টটির ডিজাইন করা হয়েছে।
কেন এই শার্ট তৈরি করা হলো? (কোটবাসার টর প্রজেক্ট)
জার্মানির বার্লিন শহরের একটি বিখ্যাত এবং ব্যস্ত এলাকা হলো কোটবাসার টর (Kottbusser Tor)। সম্প্রতি সেখানে একটি পাইলট প্রজেক্ট শুরু হয়েছে, যেখানে পাবলিক স্পেস বা জনসমাগমপূর্ণ স্থানে এআই-চালিত অত্যাধুনিক নজরদারি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এই সিস্টেমের মূল লক্ষ্য হলো শুধু ভিডিও ধারণ করা নয়, বরং মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ করা এবং কোনো সন্দেহজনক কাজ হচ্ছে কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা।
সাইমন ওয়েকার্ট এই প্রজেক্টের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তার ডিজিটাল ক্যামোফ্লেজ (Digital Camouflage) শার্টটি তৈরি করেছেন। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষকে তাদের অজান্তেই মেশিনের মাধ্যমে সবসময় নজরদারির মধ্যে রাখা এবং তাদের আচরণ বিশ্লেষণ করা একটি গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন।
তবে, ওয়েকার্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তার এই শার্টটি পুলিশকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য বা অপরাধীদের সম্পূর্ণ পরিচয় গোপন করার হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করা হয়নি। বরং, এটি একটি প্রতিবাদের ভাষা। এর মাধ্যমে তিনি সমাজকে একটি প্রশ্ন করতে চেয়েছেন— “পাবলিক স্পেস ব্যবহার করার সময় কি মানুষদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেশিনের নজরদারি ও বিশ্লেষণের শিকার হওয়া উচিত?”
কীভাবে কাজ করে এই এআই-প্রতিরোধী শার্ট?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা কম্পিউটার ভিশন (Computer Vision) সিস্টেমগুলো মানুষের মতো দেখে না। তারা একটি ছবি বা ভিডিওকে পিক্সেল, আকৃতি, রং এবং কিছু নির্দিষ্ট গাণিতিক প্যাটার্নে ভেঙে ফেলে।
ওয়েকার্ট ডিজাইন ম্যাগাজিন ‘ডিজিন’ (Dezeen)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “একটি মেশিনের কাছে একজন মানুষ হলো মূলত কিছু ভিজ্যুয়াল পরিসংখ্যানের সমষ্টি (bundle of visual statistics) – এবং ঠিক এটাই হলো মেশিনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।”
শার্টটি কীভাবে এই দুর্বলতাকে কাজে লাগায়, তার কয়েকটি ধাপ নিচে দেওয়া হলো:
১. উজ্জ্বল রং এবং ওভারল্যাপিং প্যাটার্ন
শার্টটিতে অত্যন্ত উজ্জ্বল রং এবং এমন কিছু ওভারল্যাপিং বা একে অপরের ওপর চেপে থাকা প্যাটার্ন ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানবদেহের স্বাভাবিক রূপরেখা বা আউটলাইন (Outline) লুকিয়ে ফেলে। এআই ক্যামেরা সাধারণত মানুষের মাথা, কাঁধ, হাত এবং পায়ের আকৃতি দেখে ‘মানুষ’ শনাক্ত করে। কিন্তু এই শার্ট পরলে ক্যামেরার অ্যালগরিদম সেই নির্দিষ্ট আকৃতিগুলো মেলাতে ব্যর্থ হয়।
২. অ্যাডভারসারিয়াল লুপ (Adversarial Loop) প্রযুক্তি
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই শার্টের প্যাটার্নটি তৈরি করতে সাইমন এআই (AI)-এরই সাহায্য নিয়েছেন। তিনি ‘অ্যাডভারসারিয়াল লুপ’ নামক একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। এই পদ্ধতিতে, বিভিন্ন ডিজাইনের প্যাটার্ন বারবার একটি এআই ডিটেকশন সিস্টেমের সামনে তুলে ধরা হয়। সিস্টেমটি কতটুকু আত্মবিশ্বাসের সাথে প্যাটার্নটিকে ‘মানুষ’ হিসেবে শনাক্ত করতে পারছে, তার ওপর ভিত্তি করে প্যাটার্নে পরিবর্তন আনা হয়। এই প্রক্রিয়া ততক্ষণ চলতে থাকে, যতক্ষণ না এআই সিস্টেমটি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে যায় এবং সেই প্যাটার্ন পরিহিত বস্তুকে আর মানুষ হিসেবে চিনতে না পারে।
প্রযুক্তিগত পরীক্ষা: YOLO (You Only Look Once) সিস্টেমকে ফাঁকি দেওয়া
ডিজিটাল ক্যামোফ্লেজ (Digital Camouflage) শার্টটি কাজ করে কি না, তা প্রমাণ করার জন্য ওয়েকার্ট এটি সরাসরি একটি ওপেন-সোর্স, রিয়েল-টাইম এআই অবজেক্ট-ডিটেকশন সিস্টেমের ওপর পরীক্ষা করেন। এই সিস্টেমটির নাম হলো ইওলো বা YOLO (You Only Look Once)।
YOLO বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এবং দ্রুতগতির একটি অবজেক্ট-ডিটেকশন অ্যালগরিদম, যা স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, সিসিটিভি এবং রোবোটিক্সে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
পরীক্ষায় দেখা যায়, যখন কোনো ব্যক্তি এই শার্টটি পরে ক্যামেরার সামনে আসেন, তখন YOLO ডিটেক্টর সেই পরিধানকারীকে আর ‘মানুষ’ বা ‘Person’ হিসেবে রেজিস্টার করতে পারে না। অর্থাৎ, ক্যামেরার লেন্সের সামনে থাকার পরও সিস্টেমের চোখে তিনি সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যান। বার্লিনের কোটবাসার টরে এই শার্টটির কার্যকারিতা ছবি এবং ভিডিওর মাধ্যমে সফলভাবে ডকুমেন্ট করা হয়েছে।

সীমাবদ্ধতা: এটি কি ১০০% কার্যকর?
যদিও ডিজিটাল ক্যামোফ্লেজ (Digital Camouflage) শার্টটি নির্দিষ্ট এআই সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে দারুণভাবে সফল হয়েছে, তবুও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাইমন ওয়েকার্ট নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এই শার্টটি কোনো ব্যক্তিকে প্রতিটি নজরদারি সিস্টেমের কাছে অদৃশ্য রাখার নিশ্চয়তা দেয় না।
প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। বর্তমানে ইনফ্রারেড (Infrared), থার্মাল ইমেজিং (Thermal Imaging) বা শরীরের তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করেও মানুষকে শনাক্ত করা যায়। তাছাড়া মানুষের হাঁটার ধরণ বা গেইট অ্যানালাইসিস (Gait Analysis) করেও অনেক এআই ক্যামেরা মানুষকে চিনে ফেলতে পারে। তাই শুধুমাত্র রঙের প্যাটার্ন দিয়ে সব ধরনের ক্যামেরাকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়।
মানুষের স্বাধীনতা বনাম যন্ত্রের নজরদারি: নৈতিক প্রশ্ন
সাইমন ওয়েকার্টের এই প্রজেক্ট মূলত প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের চেয়েও অনেক বেশি একটি সামাজিক বার্তা বহন করে। আমাদের আধুনিক শহরগুলো ধীরে ধীরে ‘স্মার্ট সিটি’তে রূপান্তরিত হচ্ছে। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে প্রতিটি কোণায় ক্যামেরা বসানো হচ্ছে।
নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর বিনিময়ে আমরা কি আমাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বিসর্জন দিচ্ছি? বার্লিনের কোটবাসার টর সিস্টেমের মতো প্রযুক্তিগুলো শুধু ভিডিও রেকর্ড করে না, এরা বিচার করে কে ‘স্বাভাবিক’ আচরণ করছে আর কে ‘সন্দেহজনক’। কিন্তু একটি যন্ত্র কীভাবে নির্ধারণ করবে মানুষের আচরণের স্বাভাবিকতা?
এই শার্টটি সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি নীরব প্রতিবাদ। এটি প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির যতই উন্নতি হোক না কেন, মানুষের সৃজনশীলতা সবসময় তার একটি বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে সক্ষম।
অ্যান্টি-সার্ভেইল্যান্স ফ্যাশন বা নজরদারি-বিরোধী পোশাকের ভবিষ্যৎ
‘ডিজিটাল ক্যামোফ্লেজ’ (Digital Camouflage) কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিগত কয়েক বছরে ‘অ্যান্টি-সার্ভেইল্যান্স ফ্যাশন’ (Anti-surveillance Fashion) নামক একটি নতুন ট্রেন্ড বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে। অনেক ডিজাইনারই এমন সব পোশাক, চশমা বা মেকআপ তৈরি করছেন, যা ফেসিয়াল রিকগনিশন (Facial Recognition) বা মুখমণ্ডল শনাক্তকারী ক্যামেরাকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
ভবিষ্যতে হয়তো আমরা এমন অনেক স্মার্ট-ফ্যাব্রিক দেখতে পাব, যা মানুষের প্রাইভেসি রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করবে। তবে এর সাথে সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও তাদের অ্যালগরিদম আপডেট করবে, যা একটি অন্তহীন ইঁদুর-বেড়াল খেলার জন্ম দেবে।
মাত্র ৭৭ ডলারের এই শার্টটি হয়তো আমাদের সব নজরদারি থেকে মুক্তি দেবে না, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। সাইমন ওয়েকার্টের ‘ডিজিটাল ক্যামোফ্লেজ’ (Digital Camouflage) একটি দুর্দান্ত দৃষ্টান্ত যে কীভাবে শিল্প, ফ্যাশন এবং প্রযুক্তির সংমিশ্রণে সমাজের গভীরতর সমস্যাগুলো তুলে ধরা যায়।
এআই যখন আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, তখন আমাদের নিজেদের অধিকার এবং গোপনীয়তা সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য হওয়া উচিত, মানুষকে একটি ‘ভিজ্যুয়াল পরিসংখ্যানের সমষ্টি’তে পরিণত করার জন্য নয়।
আরও Articles পড়তে দেখুন বুলেটিন বাংলা