ম্যামথের সঙ্গী কেন চিরতরে হারিয়ে গেল?

লোমশ গন্ডারের (Wooly Rhinoceros) রহস্য: ম্যামথের সঙ্গী কেন বিলুপ্ত হলো? জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন প্রমাণ

প্রাগৈতিহাসিক যুগের হিমযুগে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতো লম্বা লোমশ গন্ডারের (Wooly Rhinoceros) এক বিশেষ প্রজাতি। এরা ম্যামথের মতোই ছিলো অতি লোমশ এবং শক্তিশালী। উত্তর ইউরেশিয়ার হিমশীতল ভূখণ্ডে বাস করতো এই গন্ডারগুলো, যাদের লোম তাদের ঠান্ডা সহ্য করার জন্য নিখুঁত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এই প্রাণীরা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল কেন? সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের দিকে, মানুষের শিকারের চেয়ে। এই লোমশ গন্ডার (Wooly Rhinoceros) বিলুপ্তির রহস্য উন্মোচন করছে একটি নেকড়ের পেট থেকে পাওয়া অক্ষত ডিএনএ। আসুন জানি বিস্তারিত।

wooly rhinoceros

লোমশ গন্ডারের (Wooly Rhinoceros) জীবনযাপন এবং বাসস্থান

হিমযুগের সময়কার এই গন্ডারগুলোকে বলা হয় ‘কোয়েলোডোন্টা অ্যান্টিকুইটাটিস‘। এদের শরীর ছিল দীর্ঘ লোমে ঢাকা, যা তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও টিকে থাকার ক্ষমতা দিত। ম্যামথ, মাস্টোডনের মতো বিশালকায় প্রাণীদের সঙ্গে এরা ঘুরে বেড়াতো উত্তর ইউরেশিয়ার বিস্তীর্ণ তুষারপ্রপাত ভূমিতে। প্রধানত সাইবেরিয়া, আলাস্কা এবং উত্তর ইউরোপের ঠান্ডা অঞ্চলে ছিল তাদের আড্ডা।

এদের খাদ্য ছিল ঘাস, ছোট গাছপালা এবং টুন্ড্রা অঞ্চলের উদ্ভিদ। লম্বা চতুষ্পদ এবং শক্তিশালী শিংয়ের সাহায্যে তারা বরফের নিচে খাবার খুঁজে বের করতো। প্রায় ৩৫ হাজার বছর আগে এদের বাসস্থান ক্রমশ সঙ্কুচিত হতে থাকে। উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়ায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এদের জীবন। জলবায়ু উষ্ণতার সূচনা এখান থেকেই শুরু হয়, যা তাদের অভিযোজন ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে।

নেকড়ের পেট থেকে উঠে এলো বিলুপ্ত গন্ডারের রহস্য

২০১১ সালে সাইবেরিয়ার তুষারময় ভূমিতে একটি নেকড়ের শাবকের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়। বরফে জমে থাকা এই দেহটি হাজার হাজার বছর ধরে সেখানেই ছিল। বিজ্ঞানীরা ময়নাতদন্ত করেন এবং নেকড়ের পাকস্থলী থেকে অদ্ভুত টিস্যু পান। ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি লোমশ গন্ডারের (Wooly Rhinoceros)! এই আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতে ঝড় তুলে দেয়।

প্রায় ১৫ বছর ধরে চলা গবেষণায় সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে ক্যামিলো চাকন-ডুকের দল এই ডিএনএ সম্পূর্ণভাবে ম্যাপ করে। এটি প্রথমবারের মতো অন্য প্রাণীর পেট থেকে কোনো বিলুপ্ত প্রজাতির পূর্ণ জেনোম পাওয়া গেছে। ‘জিনোম বায়োলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন‘ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা লোমশ গন্ডার (Wooly Rhinoceros) বিলুপ্তির নতুন আলোকপাত করে। গবেষকরা অনুমান করছেন, নেকড়ের শাবক গন্ডারের মাংস খাওয়ার পরপরই ভূমিধসে মারা যায়। ফলে মাংস পাচন না হয়ে অক্ষত থেকে যায়, এবং বরফে জমে ডিএনএ সংরক্ষিত হয়।

wooly rhinoceros

বিলুপ্তির সময়কাল: পুরনো ধারণা ভুল প্রমাণিত

এতদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, এই গন্ডাররা প্রায় ১৮,৪০০ বছর আগে বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু নতুন প্রমাণ বলছে অনেক পরে, প্রায় ১৪ হাজার বছর আগেও তারা টিকে ছিল। এমনকি ১১ হাজার বছর আগেও জীবিত ছিল এই প্রজাতি। এই সময়কালে পৃথিবীর জলবায়ু দ্রুত পরিবর্তিত হয়—হিমযুগ শেষ হয়ে উষ্ণতা বাড়ে। তুষারপ্রপাত কমে যায়, উদ্ভিদের ধরন বদলে যায়। লোমশ গন্ডারেরা এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি।

জেনেটিক বিশ্লেষণে আরও চমকপ্রদ তথ্য: বিলুপ্তির ঠিক আগেও এদের জনসংখ্যা স্থিতিশীল ছিল, কোনো জিনগত অবনতি দেখা যায়নি। এর মানে, তারা সুস্থ ছিল কিন্তু বাহ্যিক চাপে দ্রুত হারিয়ে যায়। গবেষক চাকন-ডুক বলেন, “এই সময়ের খুব কম জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, তাই আমরা উত্তেজিত। এই ডিএনএ বিলুপ্তির কারণ বুঝতে সাহায্য করবে।”

মানুষের শিকার নাকি জলবায়ু পরিবর্তন? সত্য কী?

প্রথমে সবাই মনে করতো মানুষের শিকারই মূল কারণ। উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়ায় মানুষের বসতি শুরুর পর গন্ডার শিকার হয়েছে। কিন্তু নতুন গবেষণা এই ধারণা উল্টে দেয়। গবেষক লভ ডালেন বলেন, “মানুষ আসার পরও ১৫,০০০ বছর ধরে উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা ছিল লোমশ গন্ডারের (Wooly Rhinoceros)। শিকারের চেয়ে জলবায়ু পরিবর্তনই প্রধান।”

জলবায়ু উষ্ণ হওয়ায় তাদের খাবারের অভাব হয়। তুন্দ্রা গ্রাসল্যান্ড পরিণত হয় বনাঞ্চলে, যা লোমশ শরীরের জন্য অযোগ্য। তাপমাত্রা বাড়ায় তাদের লোম অতিরিক্ত গরম লাগে। ফলে জনসংখ্যা কমে, বিলুপ্তি অনিবার্য হয়। এটি আধুনিক জলবায়ু সংকটের সঙ্গে মিলে যায়—যেমন আজকের ধ্রুবীয় ভাল্লুকের ভাগ্য।

গবেষণার তাৎপর্য এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

এই আবিষ্কার শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যতকেও প্রভাবিত করে। লোমশ গন্ডারের সম্পূর্ণ জেনোম থেকে বিজ্ঞানীরা ডি-এক্সটিংকশনের চিন্তা করছেন—ম্যামথের মতোই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: দ্রুত পরিবর্তন প্রজাতিকে ধ্বংস করে। আজকের বিশ্বে এটি সতর্কবার্তা।

এছাড়া, এই গবেষণা প্রাগৈতিহাসিক ডিএনএ সংরক্ষণের নতুন পথ দেখায়। নেকড়ের পেটের মতো অপ্রত্যাশিত স্থান থেকে জেনোম পাওয়া ভবিষ্যতে আরও আবিষ্কার ঘটাবে। বিজ্ঞানীরা এখন অন্যান্য হিমযুগী প্রাণীর বিলুপ্তি নিয়ে কাজ করছেন।

wooly rhinoceros

লোমশ গন্ডার (Wooly Rhinoceros) এবং জলবায়ু পরিবর্তন:

বিষয় পুরনো ধারণা নতুন গবেষণা
বিলুপ্তির সময় ১৮,৪০০ বছর আগে ১১-১৪ হাজার বছর আগে
মূল কারণ মানুষের শিকার জলবায়ু উষ্ণতা
জনসংখ্যা কম ছিল স্থিতিশীল ছিল
প্রমাণ জীবাশ্ম নেকড়ের ডিএনএ

এই লোমশ গন্ডারের (Wooly Rhinoceros) গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করলে কী হয়। জলবায়ু পরিবর্তন আজও অনেক প্রজাতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আরও গবেষণা দরকার এই রহস্য সম্পূর্ণ উন্মোচনের জন্য।

আরও পড়ুন বুলেটিন বাংলা-য়!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top