কলকাতার কাছাকাছি ৫টি চমৎকার পক্ষী পর্যবেক্ষণ (Birdwatching) স্থান
যদি আপনি প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং পাখি পর্যবেক্ষণের আনন্দ উপভোগ করতে ভালোবাসেন, তবে কলকাতার আশপাশে এমন কিছু স্থান রয়েছে যা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য একেবারে উপযুক্ত। এখানে আপনি বিভিন্ন প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখি দেখতে পাবেন। শহরের কাছেই অবস্থিত এই স্থানগুলি প্রকৃতির মাঝে একদিন কাটানোর জন্য আদর্শ।
১. রবীন্দ্র সরোবর লেক
রবীন্দ্র সরোবর লেক, যা “কলকাতার হৃদয়” নামে পরিচিত, দক্ষিণ কলকাতায় অবস্থিত। এই স্থানটি তার সবুজ পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির জন্য বিখ্যাত। এখানে আপনি দেখতে পাবেন:
- এশিয়ান ওপেনবিল
- শিকরা
- স্টর্ক-বিলড কিংফিশার
- কপারস্মিথ বারবেট
- ইন্ডিয়ান প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচার
কীভাবে পৌঁছাবেন:
- রেলপথে: টালিগঞ্জ রেলস্টেশন।
- মেট্রোতে: রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশন।
- বাসে: বিভিন্ন বাস রুট এখানে থামে।
সকালবেলার হাঁটাচলা বা পাখি দেখার জন্য এটি নিখুঁত একটি স্থান।
২. চিন্তামণি কর পাখি অভয়ারণ্য
চিন্তামণি কর পাখি অভয়ারণ্য, যা “কোয়ালের বাগান” নামেও পরিচিত, দক্ষিণ ২৪ পরগনার রথতলা এলাকায় অবস্থিত। এটি ১৭ একর জুড়ে বিস্তৃত এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে খুব জনপ্রিয়। এখানে আপনি দেখতে পাবেন:
- ওরিয়েন্টাল হানি-বাজার্ড
- স্লেটি-লেগড ক্রেক
- স্কেলি থ্রাশ
- ব্লু-থ্রোটেড ফ্লাইক্যাচার
- লেসার র্যাকেট-টেইলড ড্রঙ্গো
কীভাবে পৌঁছাবেন:
- অবস্থান: রুবি হাসপাতাল থেকে প্রায় ১০ কিমি দূরে।
- পরিবহন: গড়িয়া থেকে বাস বা অটো রিকশা।
এই অভয়ারণ্যে সময় কাটিয়ে বিরল পাখি এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
৩. চুপি চর, পূর্বস্থলী
চুপি চর প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য স্বর্গতুল্য। ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত এই স্থানটি শীতকালে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখিদের আকর্ষণ করে। এখানে দেখতে পাবেন:
- কমন টিল
- ইউরেশিয়ান উইজন
- লিটল রিংড প্লোভার
- নর্দার্ন পিন্টেল
- ফেজান্ট-টেইলড জ্যাকানা
কীভাবে পৌঁছাবেন:
- অবস্থান: কলকাতা থেকে ১২০ কিমি দূরে।
- রেলপথে: হাওড়া থেকে কাটোয়া পর্যন্ত ট্রেনে পূর্বস্থলী স্টেশন। সেখান থেকে রিকশা।
বিশেষ করে শীতকালে, এই স্থানটি অনন্য পাখি পর্যবেক্ষণের (Birdwatching) অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
৪. বাসিপোতা
ডানকুনির কাছাকাছি বাসিপোতা একটি শান্ত গ্রাম যা পাখি পর্যবেক্ষণকারীদের জন্য আদর্শ স্থান। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখতে পাওয়া যায়, যেমন:
- ইন্ডিয়ান সিলভারবিল
- কমন রোজফিঞ্চ
- পায়েড হ্যারিয়ার
- ইয়েলো-বেলিড প্রিনিয়া
- ব্ল্যাক-শোল্ডারড কাইট
কীভাবে পৌঁছাবেন:
- অবস্থান: ডানকুনি থেকে ১০ কিমি।
- পরিবহন: উত্তরপাড়া থেকে অটো বা রিকশা।
প্রকৃতির মাঝে পাখি দেখতে এবং একটি দিন কাটানোর জন্য এটি আদর্শ।
৫. ভারতীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন
হাওড়ার শিবপুরে অবস্থিত ভারতীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন ২৭০ একর জুড়ে বিস্তৃত। এটি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল গার্ডেন নামেও পরিচিত। গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই স্থানটি পাখি ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়। এখানে আপনি দেখতে পাবেন:
- স্টর্ক-বিলড কিংফিশার
- রুফাস উডপেকার
- ব্রাউন হক আউল
- ব্রোঞ্জড ড্রঙ্গো
- ব্ল্যাক বিটার্ন
কীভাবে পৌঁছাবেন:
- অবস্থান: শিবপুর, হাওড়া।
- রেলপথে: হাওড়া রেলস্টেশন।
- সড়কপথে: বিদ্যাসাগর সেতু হয়ে গিয়ে।
এই ঐতিহাসিক স্থানটি পাখি ও প্রকৃতি উপভোগের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়।
উপসংহার
কলকাতার কাছাকাছি এই পাঁচটি জায়গা পাখি পর্যবেক্ষণ (Birdwatching) এবং প্রকৃতির মাঝে একটি দিন কাটানোর জন্য আদর্শ। আপনি যদি একজন অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষক হন বা কেবল প্রকৃতিপ্রেমী, এই স্থানগুলি আপনার জন্য নিখুঁত। শীতের কুয়াশার মধ্যে পাখির কিচিরমিচি এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখনই পরিকল্পনা করুন। এটি শুধু একটি শখ নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি চমৎকার উপায়।

ভারতে পাখি দেখার (Birdwatching) সেরা স্থানগুলো
ভারতের বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং বাস্তুসংস্থান এটিকে বিশ্বজুড়ে পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণীয় গন্তব্য করে তুলেছে। দেশের জলাভূমি, ঘন জঙ্গল, তৃণভূমি এবং উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে পাখিদের অসাধারণ বৈচিত্র্য রয়েছে, যা পাখি প্রেমীদের জন্য অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। এখানে ভারতের সাতটি বিশেষ পাখি পর্যবেক্ষণ (Birdwatching) গন্তব্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, প্রতিটি জায়গার নিজস্ব বৈচিত্র্য ও আকর্ষণ রয়েছে।
কেওলাদেও জাতীয় উদ্যান, রাজস্থান
কেওলাদেও জাতীয় উদ্যান, পূর্বে ভারতপুর বার্ড স্যাংচুয়ারি নামে পরিচিত, ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত পাখি পর্যবেক্ষণ (Birdwatching)স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম। রাজস্থানে অবস্থিত এই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটটি প্রায় ২৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি পরিযায়ী পাখিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শীতকালীন আবাসস্থল।
এই উদ্যানের জলাভূমি, অরণ্য এবং তৃণভূমির মতো বিভিন্ন বাস্তুসংস্থান প্রায় ৩৭০টি পাখি প্রজাতিকে সমর্থন করে। এখানে রঙিন সারাস ক্রেন, চিত্রিত সারস এবং ভারতীয় ডার্টারের মতো প্রজাতি দেখতে পাওয়া যায়। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে পরিদর্শন করা সবচেয়ে ভালো সময়, কারণ এই সময় পরিযায়ী পাখিরা এখানে এসে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সৃষ্টি করে।
চিলকা হ্রদ, ওড়িশা
চিলকা হ্রদ, ভারতের বৃহত্তম উপকূলীয় লেগুন, পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য এক স্বর্গ। ওড়িশায় অবস্থিত এই রামসার সাইট প্রতি বছর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী পাখিকে আকর্ষণ করে। ফ্লেমিঙ্গো, পেলিকান এবং হেরনের মতো উল্লেখযোগ্য প্রজাতি এখানে জড়ো হয়।
এই হ্রদের লবণাক্ত জল শুধু পাখি নয়, বিপন্ন ইরাওয়াডি ডলফিনেরও বাসস্থান। এর জটিল বাস্তুসংস্থান, যা রিড বেড, কাদামাটির ভূমি এবং দ্বীপ নিয়ে গঠিত, পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য এক অনন্য পটভূমি সৃষ্টি করে। মঙ্গলাজোডি গ্রাম, যা হ্রদের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত, পরিবেশ-বান্ধব পর্যটন উদ্যোগ এবং পাখি পর্যবেক্ষণ (Birdwatching) ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত।
সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান, পশ্চিমবঙ্গ
বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য পরিচিত সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান পাখিদের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে ম্যানগ্রোভ বন এবং জলপথের জটিল নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা বিভিন্ন পাখি প্রজাতির আবাসস্থল।
এখানে বিপন্ন মুখোশধারী ফিনফুট, ম্যানগ্রোভ পিট্টা এবং ব্ল্যাক-ক্যাপড কিংফিশারের মতো পাখি পাওয়া যায়। শীতকালীন মাসগুলিতে এখানে বালি চড়ুই, প্লোভার এবং ওসপ্রের মতো পরিযায়ী পাখি এসে জড়ো হয়, যা পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে।
কুমারাকম পাখি অভয়ারণ্য, কেরালা
বেম্বানাড হ্রদের তীরে অবস্থিত কুমারাকম পাখি অভয়ারণ্য কেরালার একটি শান্তিপূর্ণ পাখি পর্যবেক্ষণ (Birdwatching) স্থান। বেম্বানাড-কোল জলাভূমি বাস্তুসংস্থার অংশ, যা একটি রামসার সাইট হিসাবে চিহ্নিত। অভয়ারণ্যটি স্থানীয় ও পরিযায়ী উভয় পাখিকে আকর্ষণ করে।
এখানে ভারতীয় ডার্টার, বক এবং সাইবেরিয়ান সারাসের মতো পাখি শীতকালীন মাসগুলিতে দেখা যায়। নৌকাভ্রমণের সুযোগসহ এর শান্ত পরিবেশ পাখি পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করে তোলে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কালটি পরিযায়ী পাখিদের কারণে বিশেষভাবে সক্রিয়।
পং ড্যাম হ্রদ, হিমাচল প্রদেশ
পং ড্যাম হ্রদ, যা মহারানা প্রতাপ সাগর নামেও পরিচিত, হিমাচল প্রদেশে একটি লুকানো রত্ন। ধৌলাধর পর্বতশ্রেণির পাদদেশে অবস্থিত এই জলাধারটি মধ্য এশীয় ফ্লাইওয়ের মাধ্যমে পরিযায়ী পাখিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্রামস্থল।
এখানে প্রায় ২২০টি পাখি প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে বার-হেডেড গুজ, নর্দার্ন পিন্টেইল এবং রুডি শেলডাক উল্লেখযোগ্য। এর শান্ত পরিবেশ এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য এক আদর্শ গন্তব্য। জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে এখানে পরিযায়ী মৌসুমের চূড়ান্ত পর্যায় দেখা যায়।
থাটেকাড পাখি অভয়ারণ্য, কেরালা
থাটেকাড পাখি অভয়ারণ্য, যা সলিম আলি পাখি অভয়ারণ্য নামেও পরিচিত, দক্ষিণ ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ পাখির বাসস্থান। কেরালায় অবস্থিত এই অভয়ারণ্যটি বিখ্যাত পক্ষী বিজ্ঞানী ড. সলিম আলির নামে নামকরণ করা হয়েছে এবং এটি ৩০০টিরও বেশি পাখি প্রজাতির আবাসস্থল।
পশ্চিমঘাটের অনন্য অবস্থান অভয়ারণ্যটির বৈচিত্র্যময় জীববৈচিত্র্যে অবদান রেখেছে। এখানে মালাবার ধূসর হর্নবিল, শ্রীলঙ্কা ফ্রগমাউথ এবং হোয়াইট-বেলিড ট্রিপির মতো বিরল প্রজাতি দেখা যায়। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সময়কাল এখানে পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য সবচেয়ে ভালো।
ঈগলনেস্ট বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, অরুণাচল প্রদেশ
পূর্ব হিমালয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত ঈগলনেস্ট বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি স্বপ্নের গন্তব্য। ২০০৬ সালে বুগুন লিওচিক্লা নামক একটি নতুন পাখি প্রজাতির আবিষ্কারের পর এই অভয়ারণ্যটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে।
অভয়ারণ্যটির বিভিন্ন উচ্চতা এবং বাস্তুসংস্থান পাখিদের একটি অসাধারণ বৈচিত্র্য সমর্থন করে। এখানে ওয়ার্ডস ট্রগন, ফায়ার-টেইলড মাইজোরনিস এবং বিভিন্ন প্রজাতির সানবার্ড এবং ওয়ার্বলার দেখা যায়। নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সময় এখানে পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য আদর্শ।
ভারতের পাখি পর্যবেক্ষণ (Birdwatching) স্থানগুলো তার ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের মতোই বৈচিত্র্যময়, যা প্রতিটি প্রকৃতিপ্রেমীর জন্য অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে। চিলকা হ্রদের জলাভূমি থেকে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ এবং পং ড্যামের শান্ত পরিবেশ প্রতিটি স্থান ভারতের পাখি জীবনের সমৃদ্ধি উপভোগ করার একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করে। আপনি যদি একজন অভিজ্ঞ পক্ষীবিজ্ঞানী হন বা কেবল পাখি প্রেমিক হন, এই সাতটি গন্তব্য আপনাকে ভারতের পাখি জীবনের মহিমায় মুগ্ধ করবে।
আরও খবর জানতে ক্লিক করুন