মাটির গভীরে পাওয়া তেল,গ্যাস (oil & gas) এবং কয়লার উৎপত্তি: একটি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
পৃথিবীর শক্তি ব্যবস্থায় তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আধুনিক সভ্যতার শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং রাসায়নিক শিল্প—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে এই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন প্রায়ই আমাদের মনে আসে—তেল, গ্যাস (oil & gas) ও কয়লা কীভাবে তৈরি হয় এবং কেন এগুলো সবসময় মাটির এত গভীরে পাওয়া যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের লক্ষ লক্ষ বছর আগের পৃথিবী, তার জলবায়ু, জীবজগৎ এবং ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের দিকে তাকাতে হবে।

তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কীভাবে তৈরি হয়?
অগভীর সমুদ্র ও অণুবীক্ষণিক প্লাঙ্কটনের ভূমিকা
তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপত্তির মূল উৎস হলো লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর অগভীর সমুদ্রে বসবাসকারী অণুবীক্ষণিক জীব, যাদের আমরা প্লাঙ্কটন নামে চিনি। এই প্লাঙ্কটনের দেহে প্রচুর পরিমাণে লিপিড (চর্বি) ও জৈব যৌগ জমা থাকত। তারা সূর্যালোক ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করত এবং সেই শক্তিই পরবর্তীতে জীবাশ্ম জ্বালানির ভিত্তি তৈরি করে।
যখন এই প্লাঙ্কটনগুলো মারা যেত, তখন তাদের দেহ সমুদ্রের তলদেশে জমা হতো। সাধারণত অক্সিজেনসমৃদ্ধ পরিবেশে মৃত জৈব পদার্থ দ্রুত পচে যায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সমুদ্রের তলদেশে অক্সিজেনের ঘাটতি থাকায় এই জৈব পদার্থ সম্পূর্ণভাবে পচে যেতে পারেনি। ফলে ধীরে ধীরে এসব মৃত প্লাঙ্কটনের দেহ পলির স্তরের নিচে চাপা পড়তে থাকে।
চাপ, তাপ ও সময়: তেল ও গ্যাস (oil & Gas) গঠনের মূল চাবিকাঠি
সমুদ্রতলের পলির স্তর যত মোটা হতে থাকে, ততই নিচের জৈব পদার্থের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয় ভূগর্ভস্থ তাপ। এই তাপ ও চাপের সম্মিলিত প্রভাবে জৈব পদার্থগুলো ধীরে ধীরে রাসায়নিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়।
এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে তৈরি হয় কেরোজেন নামক এক ধরনের জৈব পদার্থ। আরও বেশি তাপ ও সময়ের প্রভাবে এই কেরোজেন ভেঙে তৈরি হয় তরল হাইড্রোকার্বন (তেল) এবং গ্যাসীয় হাইড্রোকার্বন (প্রাকৃতিক গ্যাস)। সাধারণত—
-
তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় তেল তৈরি হয়
-
বেশি তাপমাত্রায় প্রাকৃতিক গ্যাস তৈরি হয়
এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লাগে কয়েক মিলিয়ন থেকে কয়েক কোটি বছর।
কেন এখন নতুন তেল বা গ্যাস প্রায় তৈরি হয় না?
আজকের পৃথিবীর জলবায়ু, সমুদ্রের রাসায়নিক অবস্থা এবং মহাদেশগুলোর বর্তমান বিন্যাস সেই প্রাচীন সময়ের মতো অনুকূল নয়। অতীতে যেসব অগভীর সমুদ্রে বিপুল পরিমাণ প্লাঙ্কটন জন্মাত এবং অক্সিজেনহীন পরিবেশে জমা হতো, আজ সেরকম পরিবেশ খুবই বিরল। ফলে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নতুন তেল বা গ্যাস সৃষ্টি হচ্ছে না।
অন্যদিকে, মানবসভ্যতা ইতিহাসের সর্বোচ্চ হারে তেল ও গ্যাস (oil & gas) উত্তোলন করছে। অর্থাৎ আমরা যে হারে এই সম্পদ ব্যবহার করছি, সে হারে প্রকৃতি নতুন করে তা তৈরি করতে পারছে না।
কয়লা কীভাবে তৈরি হয়?
উদ্ভিদের কাষ্ঠময় অংশ থেকে কয়লার জন্ম
কয়লার উৎপত্তি তেল ও গ্যাসের (oil & gas) চেয়ে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় ঘটে। কয়লা মূলত স্থলভাগে জন্মানো উদ্ভিদের কাষ্ঠময় অংশের অবশিষ্টাংশ থেকে তৈরি। প্রায় ৩০–৩৫ কোটি বছর আগে, কার্বনিফেরাস যুগে পৃথিবীতে বিশাল বিশাল বনাঞ্চল ছিল। সেই সময় উদ্ভিদগুলোতে লিগনিন নামক একটি শক্ত প্রোটিনজাত উপাদান বিবর্তিত হয়, যা গাছকে কাঠের মতো শক্ত করে তোলে।
কিন্তু সেই সময়ের ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের মধ্যে এখনও লিগনিন ভাঙার ক্ষমতা পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। ফলে গাছ মারা গেলে তাদের কাঠ সহজে পচে যেতে পারত না।

পচনহীন উদ্ভিদ ও পিট স্তর
মৃত গাছপালা জলাভূমি বা জলমগ্ন এলাকায় জমা হতে থাকে। নতুন উদ্ভিদ পুরোনোর ওপর জন্মায় এবং ধীরে ধীরে একটি পুরু জৈব স্তর তৈরি হয়, যাকে পিট বলা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে—
-
উপর থেকে পলি ও নতুন উদ্ভিদের চাপ বাড়ে
-
নিচের স্তর সংকুচিত হয়
-
অক্সিজেনের অভাবে পচন বাধাগ্রস্ত হয়
এরপর লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই পিট স্তর ভূগর্ভস্থ তাপ ও চাপে রূপান্তরিত হয়ে প্রথমে লিগনাইট, পরে বিটুমিনাস কয়লা এবং শেষ পর্যন্ত অ্যানথ্রাসাইটে পরিণত হয়। কয়লার এই ধাপে ধাপে রূপান্তরকে বলা হয় Coalification process।
কেন এখন কয়লা তৈরির প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ?
বর্তমানে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক লিগনিন ভাঙতে সক্ষম। ফলে আজকের দিনে মৃত কাঠ দ্রুত পচে যায় এবং কয়লা তৈরির মতো পরিবেশ আর তৈরি হয় না। তাই আধুনিক যুগে অর্থবহ পরিমাণে নতুন কয়লা সৃষ্টি হচ্ছে না।
জীবাশ্ম জ্বালানি কেন মাটির গভীরে পাওয়া যায়?
ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা
তেল, গ্যাস (oil & gas) বা কয়লা—সব ক্ষেত্রেই একটি বিষয় সাধারণ:
জীবন্ত জীবের মধ্যে সঞ্চিত শক্তিকে হাইড্রোকার্বনে রূপান্তর করতে প্রয়োজন দীর্ঘ সময়, তাপ ও চাপ।
এই তাপ ও চাপ কেবলমাত্র মাটির গভীরে ভূতাত্ত্বিক স্তরগুলোর মধ্যেই পাওয়া যায়। উপরিভাগে এসব শর্ত পূরণ হয় না।
তেল ও গ্যাস (oil & gas) মজুদের গভীরতার তিনটি প্রধান কারণ
তেল ও গ্যাসের (oil & gas) অস্তিত্ব টিকে থাকার জন্য সাধারণত তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয়—
১. যথেষ্ট তাপ, চাপ ও সময়
মৃত প্লাঙ্কটনের লিপিড ও চর্বিকে ব্যবহারযোগ্য তেল বা গ্যাসে রূপান্তর করতে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে নির্দিষ্ট মাত্রার তাপ ও চাপ প্রয়োজন। এই পরিবেশ কেবল ভূগর্ভের গভীর স্তরেই পাওয়া যায়।
২. রাসায়নিক ধ্বংস থেকে সুরক্ষা
যদি তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যায়, তাহলে হাইড্রোকার্বন ভেঙে যেতে পারে। আবার অক্সিজেন বা পানির সংস্পর্শে এলে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ধ্বংসও হতে পারে। সঠিক গভীরতায় থাকলেই তেল ও গ্যাস এসব ঝুঁকি থেকে রক্ষা পায়।
৩. উপযুক্ত ভূগঠন (Trap ও Reservoir)
তেল ও গ্যাস (oil & gas) সাধারণত ছিদ্রযুক্ত শিলায় জমা হয় এবং তার ওপরে অছিদ্র শিলা থাকে, যা এগুলোকে আটকে রাখে। এই জটিল ভূগঠনও সাধারণত গভীর স্তরেই গড়ে ওঠে।

তেল ও গ্যাসের বয়স এবং গভীরতার সম্পর্ক
বেশিরভাগ পেট্রোলিয়াম মজুদ কয়েক মিলিয়ন বছর থেকে কয়েক দশ মিলিয়ন বছর পুরোনো। খুব পুরোনো (৭০ মিলিয়ন বছরের বেশি) মজুদগুলো সাধারণত আরও গভীরে চলে গেছে এবং অতিরিক্ত তাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
যেসব পুরোনো মজুদ টিকে আছে, সেগুলো সাধারণত ভারী ও নিম্নমানের—যেমন কানাডার তেল-বালু (Oil Sands) বা আলকাতরা বালি। এগুলো উত্তোলন কঠিন, ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
আগামীর আভাস
তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা—এই তিনটি জীবাশ্ম জ্বালানি আমাদের গ্রহের লক্ষ লক্ষ বছরের জীববৈচিত্র্য ও ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের ফল। অণুবীক্ষণিক প্লাঙ্কটন থেকে শুরু করে বিশাল বনভূমির উদ্ভিদ—সবাই কোনো না কোনোভাবে এই শক্তির উৎসে পরিণত হয়েছে। মাটির গভীরে তাপ, চাপ ও সময়ের সম্মিলিত প্রভাবে এই জৈব শক্তি রূপ নিয়েছে হাইড্রোকার্বনে।
আজ আমরা যে বিপুল পরিমাণে এই সম্পদ ব্যবহার করছি, তা প্রকৃতির দৃষ্টিতে অত্যন্ত সীমিত ও অপূরণীয়। তাই জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপত্তি ও সীমাবদ্ধতা বোঝা আমাদের ভবিষ্যৎ শক্তি পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগোনোর প্রয়োজনীয়তাও এখানেই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
আরও পড়ুন || বুলেটিন বাংলা