জানুন আর্টেমিস II মিশনের তারিখ, সময় ও অনান্য তথ্য

Artemis II Mission

নাসার আর্টেমিস II মিশন (Artemis II Mission)

: উৎক্ষেপণের তারিখ, মিশনের মূল বিষয় ও নভোচারীদের সম্পূর্ণ তথ্য

মানবসভ্যতার মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে নাসা। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর আবারও মানুষকে চাঁদের পথে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে আর্টেমিস II মিশন হবে এই অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই মিশনটি শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, বরং ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি ও মঙ্গল অভিযানের জন্য একটি মূল ভিত্তি তৈরি করবে।

আর্টেমিস II হলো আর্টেমিস প্রোগ্রামের প্রথম মানববাহী পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক উড়ান। এর মাধ্যমে মহাকাশচারীরা চাঁদের আশেপাশে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসবেন এবং মিশনের সময় ব্যবহৃত সব গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও জীবন-সমর্থন ব্যবস্থা যাচাই করবেন।


উৎক্ষেপণের তারিখ: কবে শূন্যে উঠবে আর্টেমিস II (Artemis II)?

নাসা ঘোষণা করেছে যে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আর্টেমিস II উৎক্ষেপণ করা হবে। উৎক্ষেপণ হবে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে। মিশনের মোট সময়কাল হবে প্রায় ১০ দিন। এই সময়ে নভোচারীরা পৃথিবীর বাইরে গিয়ে চাঁদের আশেপাশে একটি বিশেষ কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করবেন এবং তারপর নিরাপদে ফিরে আসবেন।

এই যাত্রায় মহাকাশচারীরা পৃথিবী থেকে আগে কখনও মানুষ যতদূর ভ্রমণ করেননি তার থেকেও অনেক দূরে যাবেন। ফলে বৈজ্ঞানিকভাবে এটি হবে মহাকাশ অভিযানের এক নতুন মাইলফলক।

 


Artemis II Mission

মিশনের উদ্দেশ্য কী?

আর্টেমিস II মিশনের মূল উদ্দেশ্য হলো:

  • অরায়ন (Orion) মহাকাশযানকে মানবসহ গভীর মহাকাশে পরীক্ষা করা।

  • মহাকাশচারীদের টেকসই জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, যেমন অক্সিজেন সরবরাহ ও কার্বন ডাই অক্সাইড অপসারণ যাচাই করা।

  • পৃথিবী থেকে চাঁদের দিকে মহাকাশ সফরের সময় ব্যবহৃত কমিউনিকেশন সিস্টেম এবং নাসার ডিপ স্পেস নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগ পরীক্ষা করা।

  • রকেটের উপরিভাগের চারপাশে ম্যানুয়াল ম্যানুভার (হাতে নিয়ন্ত্রিত কৌশল) প্রদর্শন করা, যা ভবিষ্যতে ডকিংয়ের প্রশিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে।


মিশনের ধাপে ধাপে যাত্রাপথ

আর্টেমিস II যাত্রাপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সুপরিকল্পিত। যাত্রাপথে নিম্নলিখিত ধাপগুলিকে অনুসরণ করা হবে:

  1. প্রথম ধাপ: স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (SLS) রকেটের মাধ্যমে অরায়ন মহাকাশযান উৎক্ষেপণ।

  2. পৃথিবী প্রদক্ষিণ: উৎক্ষেপণের পর প্রথমে পৃথিবীর নিম্নকক্ষপথে (Low Earth Orbit) প্রবেশ করবে অরায়ন।

  3. উচ্চ পৃথিবী-কক্ষপথ: পরবর্তীতে মহাকাশযানটি উচ্চ কক্ষপথে (High Earth Orbit) প্রবেশ করবে।

  4. চাঁদের পথে যাত্রা: মহাকাশযানটি চাঁদের দিকে যাত্রা শুরু করবে এবং চাঁদকে প্রায় ৪,৭০০ মাইল দূরত্ব থেকে প্রদক্ষিণ করবে।

  5. ফ্রি রিটার্ন ট্রাজেক্টরি: বিশেষ “Free Return Trajectory” ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ, চাঁদের কাছাকাছি প্রদক্ষিণ শেষে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় শক্তি ব্যবহার করে নিরাপদে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন।Artemis II Mission


নভোচারীদের ভূমিকা

আর্টেমিস II মিশনে মোট ৪ জন নভোচারী অংশগ্রহণ করবেন। তারা প্রত্যেকেই বিশেষ প্রশিক্ষিত এবং পূর্ববর্তী মহাকাশ মিশনে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। যদিও আর্টেমিস II মিশনের জন্য নভোচারীদের নাম ইতোমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের ভূমিকাগুলি হলো—

  • একজন হবেন কমান্ডার, যিনি সমগ্র মিশন পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন।

  • একজন হবেন পাইলট, যিনি অরায়ন মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণ ও নেভিগেশনে সহায়তা করবেন।

  • বাকি দুইজন থাকবেন মিশন স্পেশালিস্ট, যারা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ করবেন।

এই যৌথ দলই প্রমাণ করবে যে, ভবিষ্যতে মানুষ চাঁদে টেকসইভাবে অবস্থান করতে পারবে।


পরীক্ষামূলক কার্যক্রম

আর্টেমিস II কে শুধুমাত্র একটি চাঁদের ভ্রমণ বললে ভুল হবে। এটি আসলে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষামূলক গবেষণা। মিশনের সময় যেসব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হবে সেগুলি হলো:

  • অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা পরীক্ষা।

  • কার্বন ডাই অক্সাইড ফিল্টারিং প্রক্রিয়া কার্যকর কিনা যাচাই।

  • বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতি সামলানোর প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ।

  • মহাকাশযান থেকে নাসার সাথে রিয়েল-টাইম যোগাযোগ সফলভাবে সম্ভব হচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা।

  • ডকিং এবং অন্যান্য জটিল ম্যানুভারিং সিস্টেমের সঠিক কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ।


Artemis II Mission

কেন আর্টেমিস II গুরুত্বপূর্ণ?
  • এটি নাসার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষ বহন করবে SLS রকেট

  • ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭ মিশনের পর প্রথমবার মানুষ আবার চাঁদকে কাছ থেকে দেখবে।

  • এই মিশন সফল হলে, ভবিষ্যতে আর্টেমিস III মিশনের মাধ্যমে মানুষ চাঁদে নামবে।

  • চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করে মঙ্গলগ্রহের জন্য আরও দীর্ঘ ভ্রমণের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।


বৈজ্ঞানিক ও মানবজাতির জন্য সম্ভাবনা

আর্টেমিস II মিশন মানবজাতির জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে:

  • গভীর মহাকাশে নতুন গবেষণার সুযোগ।

  • চাঁদে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন হিলিয়াম-৩) অনুসন্ধানের পথ উন্মুক্ত হবে।

  • মহাকাশ প্রযুক্তি আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।

  • আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পৃথিবীর বাইরের মহাকাশকে শান্তিপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।


ভবিষ্যতের পথ

আর্টেমিস II এর সফল সমাপ্তির পর, নাসা পরিকল্পনা করছে আর্টেমিস III মিশন, যেখানে নভোচারীরা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামবেন। আর্টেমিস প্রোগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো চাঁদে টেকসই মানব উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং তারপর মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা


Artemis II Mission

সবশেষে

আর্টেমিস II মিশন কেবল একটি মহাকাশ অভিযান নয়, এটি মানবজাতির নতুন আশা।
এই মিশন প্রমাণ করবে যে পৃথিবীর বাইরের মহাকাশও মানুষের কাছে অধরা নয়। আর্টেমিস II সফলভাবে সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণা ও ভ্রমণ হবে আরও বিস্তৃত, সুসংগঠিত এবং মানবজীবনের জন্য সম্ভাবনায় ভরপুর।

অনান্য খবর পড়ুন || বুলেটিন বাংলা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top