২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পাসওয়ার্ডের তালিকা: আপনি কি নিরাপদ?
২০২৫ সালের শুরুতেই বিশ্বজুড়ে সাইবার সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা এক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন — আজও কোটি কোটি মানুষ এমন দুর্বল পাসওয়ার্ড (Password) ব্যবহার করছেন যা হ্যাকারদের জন্য যেন উন্মুক্ত দরজা! সাম্প্রতিক তুলনামূলক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ একটি তথ্য: ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পাসওয়ার্ড (Password) হিসেবে আবারও দেখা দিয়েছে পরিচিত কিছু সাধারণ শব্দ ও সংখ্যা, যেমন qwerty, admin, password, এবং India@123।

২০২৫ সালের বিস্ময়কর পরিসংখ্যান
Comparitech-এর সাইবার গবেষকরা প্রায় ২ বিলিয়নেরও বেশি অ্যাকাউন্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, Data Breach Forum- এ যেসব পাসওয়ার্ড (Password) প্রকাশ পেয়েছে, তার বড় অংশই অত্যন্ত সাধারণ এবং অনুমানযোগ্য। তাদের প্রতিবেদনে শীর্ষে থাকা পাসওয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে:
-
admin
-
Aa123456
-
password
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, একাই ব্যবহার করেছেন প্রায় ৭৬ লক্ষ মানুষ! অন্যদিকে admin পাসওয়ার্ডটি ১৯ লক্ষেরও বেশি অনলাইন প্রোফাইলের সিকিউরিটি কী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘India@123’ রয়েছে বিশ্বব্যাপী শত জনপ্রিয় পাসওয়ার্ডের তালিকায় ৫৩তম স্থানে।
কেন মানুষ এখনো দুর্বল পাসওয়ার্ড (Password) ব্যবহার করে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল কারণ ‘অলসতা’। অধিকাংশ ব্যবহারকারী এমন পাসওয়ার্ড নির্বাচন করেন যা সহজে মনে রাখা যায়। ফলে ABC, qwerty বা নিজের নামভিত্তিক পাসওয়ার্ড (Password) ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। অনেকেই ভুল ধারণা করেন যে, এমন সহজ শব্দের সঙ্গে এক-দুটি সংখ্যা যোগ করলেই তা নিরাপদ হবে, কিন্তু বাস্তবে এটি পাসওয়ার্ড শক্তিশালী করে না।
সাইবার সুরক্ষায় মানবীয় দুর্বলতা
মানুষের সহজাত অভ্যাস, যেমন “একই পাসওয়ার্ড বহু সাইটে ব্যবহার”, হ্যাকারদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করে। একবার কোনো ওয়েবসাইট হ্যাক হলে, সেই একই পাসওয়ার্ড দিয়ে অন্যান্য অ্যাকাউন্টেও সহজেই অনধিকার প্রবেশ সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সাইবার সুরক্ষার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক— প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, ব্যবহারকারীর ভুল সিদ্ধান্তই সব ভেঙে দিতে পারে।
পাসওয়ার্ড (Password) তৈরিতে সাধারণ নিয়ম
মাইক্রোসফ্ট এবং অন্যান্য সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বলছে, একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি করতে অন্তত ১২টি অক্ষর থাকা প্রয়োজন। সেটিতে বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্নের সমন্বয় থাকতে হবে। যেমন MySafe@2025Pass! – এই ধরনের পাসওয়ার্ড অনুমান করা প্রায় অসম্ভব।
সঙ্গে আরও কিছু সাধারণ নিয়ম মানা জরুরি:
-
নিজের নাম, পরিবারের নাম, জন্মতারিখ বা জনপ্রিয় শব্দ ব্যবহার করবেন না।
-
একই পাসওয়ার্ড (Password) একাধিক অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করবেন না।
-
নিয়মিত সময় অন্তর পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।
-
দ্বিগুণ সুরক্ষার জন্য টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখুন।
দুর্ঘটনার বাস্তব উদাহরণ: ল্যুভর জাদুঘরের ঘটনা
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ফ্রান্সের ল্যুভর জাদুঘরে ঘটে যাওয়া বহুল আলোচিত চুরির ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে পাসওয়ার্ড (Password) সুরক্ষার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ANSSI এই কেস তদন্তে আবিষ্কার করে যে, জাদুঘরের প্রাথমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুরক্ষিত ছিল এক অবিশ্বাস্য সহজ পাসওয়ার্ড দ্বারা — LOUVRE!
এর আগে ২০১৪ সালের অডিটেও সংস্থাটি এই দুর্বল পাসওয়ার্ডের ঝুঁকি চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু যথাযথ পরিবর্তন হয়নি। ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি চারজন অস্ত্রধারী দুষ্কৃতিকারী নির্মাণশ্রমিকের বেশে রাতে জাদুঘরের অ্যাপোলো গ্যালারিতে হানা দেয় এবং আনুমানিক ৯০০ কোটি টাকার শিল্পকর্ম নিয়ে পালায়।
এই ঘটনাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ এটি দেখিয়েছে, দুর্বল পাসওয়ার্ড শুধু ব্যক্তিগত ডেটা নয়, জাতীয় ঐতিহ্যকেও বিপদের মুখে ফেলতে পারে। একবার কোনও সিস্টেমে প্রবেশাধিকার পেলে হ্যাকাররা কেবল তথ্যই নয়, ভৌত অবকাঠামোতেও ক্ষতি করতে পারে। এটি সাইবার যুদ্ধের নতুন মাত্রা বহন করে।
২০২৫ সালের ট্রেন্ড: মানুষ এখনো একই ফাঁদে!
যদিও প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে—আজ আমাদের আছে ফেস আইডি, বাইওমেট্রিক লগইন, এমনকি পাসওয়ার্ডলেস অথেনটিকেশন—তবুও অধিকাংশ মানুষ পুরনো পদ্ধতিতে আটকে আছেন। বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, যতদিন না ব্যবহারকারীরা সচেতন হচ্ছেন, ততদিন সাইবার হামলার হার কমবে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফিশিং ইমেইল, সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, বা অনুমানযোগ্য পাসওয়ার্ডই এই আক্রমণের মূল চাবিকাঠি।
২০২৫ সালের সর্বাধিক ব্যবহৃত ১১টি পাসওয়ার্ড
Comparitech রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ২০টি দুর্বল পাসওয়ার্ড নিম্নরূপ:
- admin
- password
- qwerty
- Aa123456
- abc123
- 1q2w3e4r5t
- iloveyou
- welcome
- Password@123
- India@123
- user
এই তালিকা থেকেই বোঝা যায়—মানুষ এখনো সাধারণ প্যাটার্নে আটকে আছে। সহজতা ও মনে রাখার সুবিধার জন্যই এমন পাসওয়ার্ডগুলো ঝুঁকির সৃষ্টি করছে।
পাসওয়ার্ড (Password) চুরির পেছনে হ্যাকারদের মনস্তত্ত্ব
হ্যাকাররা পাসওয়ার্ড (Password) অনুমানের জন্য ‘ডিকশনারি অ্যাটাক’, ‘ব্রুট ফোর্স অ্যাটাক’ ও ‘ফিশিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে। এসব পদ্ধতিতে মিলিয়ন সংখ্যক শব্দ ও সংখ্যা একটার পর একটা পরীক্ষা করা হয় যতক্ষণ না সঠিক কম্বিনেশন পাওয়া যায়। যদি কোনো পাসওয়ার্ড হয় বা qwerty
– হ্যাকাররা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা ভেঙে ফেলতে সক্ষম।
কিভাবে নিজের ডিজিটাল উপস্থিতি সুরক্ষিত রাখবেন
আপনার অনলাইন সুরক্ষার জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:
-
একটি পাসওয়ার্ড ম্যানেজার (Password Manager) ব্যবহার করুন যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জটিল ও ইউনিক পাসওয়ার্ড তৈরি করে।
-
টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন বা বায়োমেট্রিক লগইন চালু রাখুন।
-
ফিশিং ইমেইল বা সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন।
-
সরকারি পোর্টাল বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ছাড়া অন্যত্র আপনার পাসওয়ার্ড কখনও শেয়ার করবেন না।
-
নিয়মিতভাবে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে সুরক্ষার স্তর বজায় রাখুন।
কর্পোরেট ক্ষেত্রে পাসওয়ার্ড নীতি
অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ‘জিরো ট্রাস্ট সাইবার সিকিউরিটি’ মডেল গ্রহণ করছে যেখানে প্রত্যেক লগইনের সময়ই যাচাই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালে বহু কোম্পানি পুরনো login-password সিস্টেম বাদ দিয়ে passkey-based authentication চালু করেছে। এই নতুন পদ্ধতিতে ফিজিক্যাল ডিভাইস বা বায়োমেট্রিক যাচাই ব্যবহৃত হয় যা অনুমানযোগ্য নয়।
প্রযুক্তি যতই উন্নত, দায় তবে ব্যবহারকারীর
একটি সুরক্ষিত ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য প্রযুক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ব্যবহারকারীর সচেতনতা। অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই অগ্রসর হোক না কেন, যদি ব্যবহারকারী দুর্বল পাসওয়ার্ড বেছে নেন, তাহলে সুরক্ষার পুরো কাঠামোই ভেঙে পড়ে। অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার প্রথম পদক্ষেপই হলো সচেতন পাসওয়ার্ড তৈরি করা।
ভবিষ্যতের সাইবার নিরাপত্তার দিকনির্দেশ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী বছরগুলোতে পাসওয়ার্ডের ব্যবহার ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে। তার জায়গা নেবে ফেস রিকগনিশন, ভয়েস অথেনটিকেশন ও ডিভাইস-ভিত্তিক যাচাই। যদিও এই পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ, তবু বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর নিরাপত্তা কৌশল হলো শক্তিশালী ও ইউনিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা, যা প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা হবে।
সঠিক পাসওয়ার্ড ও সচেতনতা
সর্বাধিক ব্যবহৃত পাসওয়ার্ডের তালিকা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের অনলাইন সংস্কৃতির প্রতিফলন। আমরা যতদিন ‘সহজে মনে রাখার’ অভ্যাসে আবদ্ধ থাকব, ততদিন সাইবার অপরাধীরা ঠিক ততটাই শক্তিশালী থাকবে। এই পরিবর্তন শুরু হোক এখন থেকেই — কারণ আপনার নিরাপত্তা আপনার হাতেই।
এই রকমের আরও খবর পড়তে, জানতে দেখুন বুলেটিন বাংলা
