বাসন্তী পূজা (Basanti Puja) ২০২৬: ইতিহাস, মাহাত্ম্য, তারিখ ও পূজা বিধি

বাসন্তী পূজা (Basnti Puja) বা চৈত্র নবরাত্রি হলো দেবী দুর্গার প্রাচীনতম উপাসনা পদ্ধতি, যা বসন্তকালের চৈত্র শুক্লপক্ষে পালিত হয়। এটি শারদীয়া দুর্গোৎসবের আগের রূপ এবং পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, বাংলাদেশের কয়েকটি অঞ্চলে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। পুরাণে দেবীর চারটি বাহনের উল্লেখ আছে—হাতি (গজ), ঘোড়া (ঘোটক), পালকি (দোলা) এবং নৌকা—যা মর্ত্যে আগমন-গমনের প্রতীক। ২০২৬ সালে এই পুজোয় দেবী হাতিতে চড়ে আসবেন ও যাবেন, যা অত্যন্ত শুভ লক্ষণ বলে বিবেচিত। এতে ধন-সম্পদ, সৌভাগ্য বৃদ্ধি পাওয়ার বিশ্বাস রয়েছে।

বাসন্তী পূজা (Basanti Puja): রাজা সুরথ ও দেবী মহামায়ার আখ্যান
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বাসন্তী পূজা (Basanti Puja) এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা দেবী দুর্গার বসন্তকালীন আরাধনা হিসেবে পরিচিত। এই পূজা মূলত চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত হয় এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনী, যা রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধির জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে, এই কাহিনী কেবল বাসন্তী পূজার উৎপত্তির ইতিহাসই বর্ণনা করে না, বরং মানব জীবনের মোহ, আসক্তি এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির এক গভীর বার্তাও বহন করে।
রাজা সুরথের কাহিনী
প্রাচীনকালে সুরথ নামে এক ধর্মপ্রাণ, প্রজাবৎসল এবং মহাত্মা রাজা ছিলেন। তিনি জন্মগত ক্ষত্রিয় ছিলেন এবং জীবনে কোনো যুদ্ধে পরাজিত হননি। তাঁর রাজ্য সুখ ও সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ ছিল এবং তিনি প্রায়শই রাজ্যের মঙ্গলের জন্য যজ্ঞের আয়োজন করতেন। কিন্তু তাঁর রাজ্যের প্রতিবেশী যবন জাতি রাজ্য সুরথের প্রতি হিংসাত্মক মনোভাব পোষণ করত।
একদিন যবন রাজ্য সুরথের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সুরথ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন এবং মাঘী পূর্ণিমার তৃতীয়া তিথিতে যুদ্ধ শুরু হয়। দুর্ভাগ্যবশত, এই যুদ্ধে সুরথ যবন জাতির হাতে পরাজিত হন। এই সুযোগে তাঁর মন্ত্রী ও সভাসদরা তাঁর ধনসম্পদ এবং সেনাবাহিনীর দখল নেয়। সভাসদদের এই বিশ্বাসঘাতকতা দেখে সুরথ হতভম্ব হয়ে যান। তিনি উপলব্ধি করেন যে, যবন জাতি অন্তত সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু তাঁর নিজের লোকেরাই তাঁকে পেছন থেকে আঘাত করেছে।
মনের দুঃখে সুরথ তাঁর রাজ্য ত্যাগ করে বনে চলে আসেন। তিনি জানতেন যে, পরাজিত অবস্থায় রাজ্যে ফিরে গেলে তাঁকে হত্যা করা হতে পারে। বনে ঘুরতে ঘুরতে তিনি মেধা ঋষির আশ্রমে উপস্থিত হন। মেধা ঋষি তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং আশ্রয় দেন।
সুরথ ও সমাধির সাক্ষাৎ
বনে আশ্রয় পেলেও রাজা সুরথের মনে শান্তি ছিল না। তিনি সর্বদা তাঁর হারানো রাজ্যের ভালো-মন্দের কথা ভেবে চিন্তিত থাকতেন। একদিন বনের মধ্যে তাঁর সঙ্গে সমাধি নামে এক বৈশ্যের দেখা হয়। সমাধির সঙ্গে কথা বলে সুরথ জানতে পারেন যে, সমাধির স্ত্রী ও পুত্ররা তাঁর সমস্ত ধনসম্পদ কেড়ে নিয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সমাধি নিজেও তাঁর স্ত্রী ও পুত্রদের কল্যাণ-অকল্যাণের কথা ভেবে শঙ্কিত হতেন।
এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে সুরথ ও সমাধির মনে একই প্রশ্ন জাগে: যারা তাঁদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে, তাদের প্রতি তাঁদের মনে কেন রাগ বা ঘৃণা জন্মায়নি? কেনই বা তাঁরা সেইসব মানুষের ভালো-মন্দের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন?
দেবী মহামায়ার প্রভাব
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে তাঁরা দুজনেই মেধা ঋষির কাছে যান। ঋষি তাঁদের বলেন যে, এটি পরমেশ্বরী মহামায়ারই প্রভাব। মহামায়া তাঁর মায়া দ্বারা সমস্ত জীবকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখেন। সুরথ মহামায়া সম্পর্কে জানতে চাইলে, মেধা ঋষি তাঁকে একে একে তিনটি গল্প শোনান, যা শ্রীশ্রীচণ্ডী-র মূল বিষয়বস্তু। এই গল্পগুলির মাধ্যমে দেবী মহামায়ার মহিমা এবং তাঁর সৃষ্টির উপর প্রভাব ব্যাখ্যা করা হয়।
তপস্যা ও বরলাভ
মেধা ঋষির গল্প শুনে সুরথ ও সমাধি নদীর তীরে তিন বছর ধরে কঠিন তপস্যা করেন। তাঁদের তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে দেবী মহামায়া আবির্ভূত হন। দেবী তাঁদের বর চাইতে বললে, সুরথ ও সমাধি কোনো জাগতিক বর না চেয়ে তাঁদের মনের গ্লানি ও মোহ থেকে মুক্তির প্রার্থনা করেন।
দেবী মহামায়া তাঁদের প্রার্থনা শুনে সুরথ রাজাকে তাঁর হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দেন এবং বৈশ্য সমাধিকে তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করেন। সমাধি তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে নিজের জীবনযাত্রায় ফিরে যান।
বাসন্তী পূজার সূচনা
রাজ্য ফিরে পেয়েও সুরথ রাজার মনে এক অপূর্ণতা রয়ে যায়। তিনি আবার বনে এসে মেধা মুনির আশ্রমে ফিরে আসেন এবং তাঁর অতৃপ্তির কথা মুনির কাছে ব্যক্ত করেন। রাজার কথা শুনে মেধা মুনি সুরথকে দেবী মহামায়ার পূজা করার পরামর্শ দেন।
সুরথ রাজা তখন মনস্থির করেন যে, যে দেবীর কৃপায় তিনি রাজ্যভার ফিরে পেয়েছেন, সেই মহামায়ার পূজা করবেন এবং সৃষ্টিকে মায়ের কৃপাধন্য করবেন। তিনি মেধা মুনিকে জিজ্ঞাসা করেন কখন মায়ের পূজা করতে হবে। মেধা মুনি তখন বলেন যে, চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে ষষ্ঠী তিথিতে মায়ের বোধন সহ পূজা আরম্ভ হবে।
পূজার প্রচলন সম্পর্কে রাজা জানতে চাইলে মেধা মুনি শাস্ত্রীয় বিধান বর্ণনা করেন:
দুর্গাষষ্ঠী: আমন্ত্রণ ও অধিবাস।
মহাসপ্তমী: নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তম্যাদিকল্পারম্ভ, সপ্তমীবিহিত পূজা।
মহাষ্টমী: মহাষ্টম্যাদিকল্পারম্ভ, কেবল মহাষ্টমীকল্পারম্ভ, মহাষ্টমীবিহিত পূজা, মহাষ্টমী ব্রতোপবাস, কুমারী পূজা, অর্ধরাত্রবিহিত পূজা, সন্ধিপূজা।
মহানবমী: কেবল মহানবমীকল্পারম্ভ, মহানবমী বিহিত পূজা।
বিজয়াদশমী: বিজয়াদশমী পরবর্তী বিসর্জনাঙ্গ পূজা, বিসর্জন, বিজয়াদশমী কৃত্য ও কুলাচারানুসারে বিসর্জনান্তে অপরাজিতা দেবীর পূজা।
এই সমস্ত নিয়মাবলী জানার পর, চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে মেধা মুনির আশ্রমে রাজা সুরথ প্রথম দুর্গাপূজার (যা বাসন্তী পূজা (Basanti Puja) নামে পরিচিত) প্রচলন করেন। এরপর থেকে প্রতি বছর সুরথ রাজা নিজ রাজপ্রাসাদে এই পূজা আয়োজন করতেন।
বাসন্তী পূজা (Basanti Puja) কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মোহ, আসক্তি এবং আত্মোপলব্ধির এক গভীর প্রতীক। রাজা সুরথের কাহিনী আমাদের শেখায় যে, জাগতিক প্রাপ্তি বা ক্ষতি জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং আধ্যাত্মিক শান্তি ও দেবীর কৃপা লাভই প্রকৃত উদ্দেশ্য। এই পূজা আজও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হৃদয়ে ভক্তি ও বিশ্বাসের শিখা প্রজ্বলিত করে চলেছে, যা বসন্তের আগমনের সাথে সাথে নতুন আশার বার্তা বয়ে আনে।

ঐতিহাসিক পটভূমি

বাসন্তী পুজোর (Basnti Puja) উৎপত্তি মার্কণ্ডেয় পুরাণ এবং দেবীমাহাত্ম্য থেকে। রাজা সুরথ (চিত্রগুপ্তবংশীয়) এবং বণিক সমাধি ঋষি মেধাতিথির আশ্রমে দুর্গতির মুখে পড়ে মেধা ঋষির পরামর্শে বসন্তকালে প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন। মৃৎপাত্রে তৈরি দেবীমূর্তি দিয়ে চণ্ডীপাঠ করে তারা মহামায়ার আশীর্বাদ লাভ করেন, রাজ্য ও সম্পদ ফিরে পান। এটিই বাংলার আদি দুর্গাপূজা। শ্রীরামচন্দ্রের অকাল বোধন কাহিনীও এর সঙ্গে যুক্ত—রাবণবধের আগে চৈত্রে দেবীকে জাগিয়ে পূজা করেন, যা পরে শারদীয়া পুজোর ভিত্তি হয়। রাজবাড়ি ও পারিবারিক ঐতিহ্যে এর প্রচলন অটুট রয়েছে।

Basanti Puja

২০২৬ সালের বাসন্তী পূজোর (Bansanti Puja) তারিখসূচী

২০২৬-এ বাসন্তী পূজা (Basnti Puja) ২৪ মার্চ থেকে শুরু হবে এবং ৩০ মার্চ বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে।

  • ষষ্ঠী (২৪ মার্চ, মঙ্গলবার): ঘটস্থাপন ও দেবী আগমন।

  • সপ্তমী (২৫ মার্চ, বুধবার): নবপত্রিকা স্নান, সপ্তমী পূজা।

  • অষ্টমী (২৬ মার্চ, বৃহস্পতিবার): অষ্টমী পূজা, সন্ধিপূজা, ভোয়া খাওয়ানো।

  • নবমী (২৭ মার্চ, শুক্রবার): নবমী পূজা, রামনবমী উদযাপন।

  • দশমী (৩০ মার্চ, শনিবার): বিসর্জন ও উৎসর্গ।
    এই তারিখগুলো বাংলা পঞ্জিকা ১৪৩২ অনুসারে নির্ধারিত, যা পশ্চিমবঙ্গে প্রযোজ্য।

মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব

বাসন্তী পুজোর (Basnti Puja) মাহাত্ম্য অপার—এতে দেবী মহামায়া দুর্গা অসুবলক্ষ্মী দূর করে সমৃদ্ধি বরন করেন। হাতির বাহনে আগমন-গমন সম্পদবৃদ্ধির প্রতীক। বৈষ্ণব-শাক্ত প্রভাবে রামনবমী (নবমী তিথি) এর সঙ্গে যুক্ত, যেখানে শ্রীরামের জন্মোৎসব পালিত হয়। এটি আধ্যাত্মিক শুদ্ধি, সৌভাগ্য ও পরিবারের কল্যাণ ঘটায়। বসন্তকালের ফুল-পাতায় সজ্জিত পূজা প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা স্থাপন করে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই পূজা করে রাজা সুরথের মতো দুর্ভাগ্য দূর হয়।

পূজা বিধি ও আচার

পূজা শুরু ঘটস্থাপন দিয়ে—ঘটে জল, গঙ্গাজল, পঞ্চরত্ন, আমপাতা, নারকেল স্থাপন। চণ্ডীপাঠ, দুর্গাসপ্তশতী পাঠ, পঞ্চোপচার অর্পণ করুন। সপ্তমীতে নবপত্রিকা (নয়টি গাছের পাতা) স্নান, অষ্টমীতে সন্ধিপূজা (২৮ মিনিট), প্রতীকী বলি। নৈবেদ্যে খিচুড়ি, লাবড়া, আলুর দম, পায়েস দিন। বাড়িতে পুরোহিত না থাকলে মন্ত্রগ্রন্থ বা অডিও ব্যবহার করুন। উপবাসে ফলাহার, দুধ-ফল খান। নবমীতে রামনবমী পূজায় রামরক্ষা স্তোত্র পাঠ করুন।

Basanti Puja

বিখ্যাত পালনস্থল

পশ্চিমবঙ্গে নদিয়ার কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি, শান্তিপুরের ফটকপাড়া বুড়ো শিবতলা (৪০০ বছরের প্রাচীন), বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদে ধুমধাম। কলকাতায় আদ্যাপীঠ মন্দির, আলমবাজার রামকৃষ্ণ মঠ, সুকচর ভবাপাগলা আশ্রমে হয়। ওড়িশার কিছু অঞ্চলে রাজবাড়ি-ভিত্তিক। এখানে প্রতিমা মাটি-লোহার তৈরি, শারদীয়ার মতোই মণ্ডপ সাজানো হয়।

Basanti Puja

রামনবমীর সঙ্গে যোগসূত্র

চৈত্র নবমীতে রামনবমী পালন বাসন্তী পুজোকে (Basnti Puja) বৈষ্ণব রঙ দেয়। শ্রীরামের জন্মতিথি হিসেবে অযোধ্যারাজ দশরথ-কৌশল্যার পুত্র রামের জন্মোৎসব। অকাল বোধনের মাধ্যমে রামের পূজা থেকে এই যোগ। পুজোয় রাম-সীতা-লক্ষ্মণের ছবি স্থাপন, কীর্তন হয়। এতে ভক্তি ও কর্মযোগের সমন্বয় ঘটে।

বাসন্তী পুজোর বৈশিষ্ট্য
  • সময়কাল: ৫ দিন (ষষ্ঠী-দশমী), বসন্তের ফুল-পালং শোভা।

  • প্রতিমা: মাটির তৈরী, সাধারণ ও সোনালি-লাল সাজ।

  • উপাসনা: চণ্ডীপাঠ, অঞ্জলি, আরতি; বলি প্রতীকী (কলা-দই)।

  • পার্থক্য: শারদীয়ার চেয়ে পারিবারিক, কম জনাকীর্ণ।

  • শুভ ফল: সম্পদ, সন্তান-সুস্থতা, দুর্ভাগ্যনাশ।

বাড়িতে পূজা প্রস্তুতি টিপস

পূজা ঘর পরিষ্কার করুন, বেদীতে ঘট রাখুন। নবপত্রিকা সংগ্রহ করুন: আম, বেল, জবা ইত্যাদি। উপবাসে শাকাহারী থাকুন, রামনাম জপ করুন। বিসর্জনে গঙ্গাজলে প্রতিমা ভাসান। এই পুজো করে বাঙালিরা ঐতিহ্য রক্ষা করে। ২০২৬-এর এই উৎসব নিশ্চয়ই আপনার জীবনে শুভবৃদ্ধি আনবে।

দেখুন বুলেটিন বাংলা ॥ জানুন নতুন কিছু

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top