বাসন্তী পূজা (Basnti Puja) বা চৈত্র নবরাত্রি হলো দেবী দুর্গার প্রাচীনতম উপাসনা পদ্ধতি, যা বসন্তকালের চৈত্র শুক্লপক্ষে পালিত হয়। এটি শারদীয়া দুর্গোৎসবের আগের রূপ এবং পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, বাংলাদেশের কয়েকটি অঞ্চলে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। পুরাণে দেবীর চারটি বাহনের উল্লেখ আছে—হাতি (গজ), ঘোড়া (ঘোটক), পালকি (দোলা) এবং নৌকা—যা মর্ত্যে আগমন-গমনের প্রতীক। ২০২৬ সালে এই পুজোয় দেবী হাতিতে চড়ে আসবেন ও যাবেন, যা অত্যন্ত শুভ লক্ষণ বলে বিবেচিত। এতে ধন-সম্পদ, সৌভাগ্য বৃদ্ধি পাওয়ার বিশ্বাস রয়েছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি
বাসন্তী পুজোর (Basnti Puja) উৎপত্তি মার্কণ্ডেয় পুরাণ এবং দেবীমাহাত্ম্য থেকে। রাজা সুরথ (চিত্রগুপ্তবংশীয়) এবং বণিক সমাধি ঋষি মেধাতিথির আশ্রমে দুর্গতির মুখে পড়ে মেধা ঋষির পরামর্শে বসন্তকালে প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন। মৃৎপাত্রে তৈরি দেবীমূর্তি দিয়ে চণ্ডীপাঠ করে তারা মহামায়ার আশীর্বাদ লাভ করেন, রাজ্য ও সম্পদ ফিরে পান। এটিই বাংলার আদি দুর্গাপূজা। শ্রীরামচন্দ্রের অকাল বোধন কাহিনীও এর সঙ্গে যুক্ত—রাবণবধের আগে চৈত্রে দেবীকে জাগিয়ে পূজা করেন, যা পরে শারদীয়া পুজোর ভিত্তি হয়। রাজবাড়ি ও পারিবারিক ঐতিহ্যে এর প্রচলন অটুট রয়েছে।

২০২৬ সালের বাসন্তী পূজোর (Bansanti Puja) তারিখসূচী
২০২৬-এ বাসন্তী পূজা (Basnti Puja) ২৪ মার্চ থেকে শুরু হবে এবং ৩০ মার্চ বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে।
-
ষষ্ঠী (২৪ মার্চ, মঙ্গলবার): ঘটস্থাপন ও দেবী আগমন।
-
সপ্তমী (২৫ মার্চ, বুধবার): নবপত্রিকা স্নান, সপ্তমী পূজা।
-
অষ্টমী (২৬ মার্চ, বৃহস্পতিবার): অষ্টমী পূজা, সন্ধিপূজা, ভোয়া খাওয়ানো।
-
নবমী (২৭ মার্চ, শুক্রবার): নবমী পূজা, রামনবমী উদযাপন।
-
দশমী (৩০ মার্চ, শনিবার): বিসর্জন ও উৎসর্গ।
এই তারিখগুলো বাংলা পঞ্জিকা ১৪৩২ অনুসারে নির্ধারিত, যা পশ্চিমবঙ্গে প্রযোজ্য।
মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব
বাসন্তী পুজোর (Basnti Puja) মাহাত্ম্য অপার—এতে দেবী মহামায়া দুর্গা অসুবলক্ষ্মী দূর করে সমৃদ্ধি বরন করেন। হাতির বাহনে আগমন-গমন সম্পদবৃদ্ধির প্রতীক। বৈষ্ণব-শাক্ত প্রভাবে রামনবমী (নবমী তিথি) এর সঙ্গে যুক্ত, যেখানে শ্রীরামের জন্মোৎসব পালিত হয়। এটি আধ্যাত্মিক শুদ্ধি, সৌভাগ্য ও পরিবারের কল্যাণ ঘটায়। বসন্তকালের ফুল-পাতায় সজ্জিত পূজা প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা স্থাপন করে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই পূজা করে রাজা সুরথের মতো দুর্ভাগ্য দূর হয়।
পূজা বিধি ও আচার
পূজা শুরু ঘটস্থাপন দিয়ে—ঘটে জল, গঙ্গাজল, পঞ্চরত্ন, আমপাতা, নারকেল স্থাপন। চণ্ডীপাঠ, দুর্গাসপ্তশতী পাঠ, পঞ্চোপচার অর্পণ করুন। সপ্তমীতে নবপত্রিকা (নয়টি গাছের পাতা) স্নান, অষ্টমীতে সন্ধিপূজা (২৮ মিনিট), প্রতীকী বলি। নৈবেদ্যে খিচুড়ি, লাবড়া, আলুর দম, পায়েস দিন। বাড়িতে পুরোহিত না থাকলে মন্ত্রগ্রন্থ বা অডিও ব্যবহার করুন। উপবাসে ফলাহার, দুধ-ফল খান। নবমীতে রামনবমী পূজায় রামরক্ষা স্তোত্র পাঠ করুন।

বিখ্যাত পালনস্থল
পশ্চিমবঙ্গে নদিয়ার কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি, শান্তিপুরের ফটকপাড়া বুড়ো শিবতলা (৪০০ বছরের প্রাচীন), বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদে ধুমধাম। কলকাতায় আদ্যাপীঠ মন্দির, আলমবাজার রামকৃষ্ণ মঠ, সুকচর ভবাপাগলা আশ্রমে হয়। ওড়িশার কিছু অঞ্চলে রাজবাড়ি-ভিত্তিক। এখানে প্রতিমা মাটি-লোহার তৈরি, শারদীয়ার মতোই মণ্ডপ সাজানো হয়।

রামনবমীর সঙ্গে যোগসূত্র
চৈত্র নবমীতে রামনবমী পালন বাসন্তী পুজোকে (Basnti Puja) বৈষ্ণব রঙ দেয়। শ্রীরামের জন্মতিথি হিসেবে অযোধ্যারাজ দশরথ-কৌশল্যার পুত্র রামের জন্মোৎসব। অকাল বোধনের মাধ্যমে রামের পূজা থেকে এই যোগ। পুজোয় রাম-সীতা-লক্ষ্মণের ছবি স্থাপন, কীর্তন হয়। এতে ভক্তি ও কর্মযোগের সমন্বয় ঘটে।
বাসন্তী পুজোর বৈশিষ্ট্য
-
সময়কাল: ৫ দিন (ষষ্ঠী-দশমী), বসন্তের ফুল-পালং শোভা।
-
প্রতিমা: মাটির তৈরী, সাধারণ ও সোনালি-লাল সাজ।
-
উপাসনা: চণ্ডীপাঠ, অঞ্জলি, আরতি; বলি প্রতীকী (কলা-দই)।
-
পার্থক্য: শারদীয়ার চেয়ে পারিবারিক, কম জনাকীর্ণ।
-
শুভ ফল: সম্পদ, সন্তান-সুস্থতা, দুর্ভাগ্যনাশ।
বাড়িতে পূজা প্রস্তুতি টিপস
পূজা ঘর পরিষ্কার করুন, বেদীতে ঘট রাখুন। নবপত্রিকা সংগ্রহ করুন: আম, বেল, জবা ইত্যাদি। উপবাসে শাকাহারী থাকুন, রামনাম জপ করুন। বিসর্জনে গঙ্গাজলে প্রতিমা ভাসান। এই পুজো করে বাঙালিরা ঐতিহ্য রক্ষা করে। ২০২৬-এর এই উৎসব নিশ্চয়ই আপনার জীবনে শুভবৃদ্ধি আনবে।
দেখুন বুলেটিন বাংলা ॥ জানুন নতুন কিছু