অন্নপূর্ণা পূজা (Annapurna Puja) ২০২৬: মা অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য, শিবের ভিক্ষা কাহিনী এবং পূজার নিয়ম
চৈত্র মাসের শুক্ল অষ্টমী তিথিতে বাঙালির ঘরে ঘরে মা অন্নপূর্ণার পূজা হয়ে ওঠে বিশেষ উৎসবের মতো। এই পূজা কেবল ধর্মীয় আচারই নয়, বরং পরিবারের সমৃদ্ধি, সন্তানের মঙ্গল এবং খাদ্যসমৃদ্ধির প্রতীক।
অন্নপূর্ণা দেবীর পরিচয় এবং গুরুত্ব
দেবী অন্নপূর্ণা হলেন পার্বতীর একটি স্বরূপ, যিনি বিশ্বের সমস্ত প্রাণীর ক্ষুধা নিবারণ করেন এবং অন্ন বা খাদ্যের প্রদানকারী। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল কাব্য’-এ তাঁর প্রকাশ কাশীতে বর্ণিত হয়েছে: “আমি দেবী অন্নপূর্ণা প্রকাশ কাশীতে, চৈত্রমাসে মোর পূজা শুক্ল অষ্টমীতে।” এই দেবী সংসারের পুষ্টি ও সমৃদ্ধির রক্ষক হিসেবে পূজিত হন। বাংলা সংস্কৃতিতে তাঁকে ‘অন্নদা মা’ বলে ডাকা হয়, কারণ তিনি দুধ-ভাতে সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন। কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি বাড়িতে এই পূজা হয়, যা বাসন্তী পূজার অংশ হিসেবে চৈত্র নবরাত্রির অষ্টম দিনে পালিত হয়।
দেবীর মূর্তিতে দেখা যায়, তাঁর হাতে থালা-ভাঁড়ার সহ অন্ন বিতরণের ভঙ্গি। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি সমগ্র জগতের অন্নভাণ্ডারের অধিষ্ঠাত্রী। কাশী থেকে উদ্ভূত এই পূজা বাংলায় এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে, আজ প্রতি বছর লক্ষাধিক পরিবার এতে অংশ নেয়।

শিবের কাছে অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য: কেন হাত পাতলেন মহাদেব?
প্রাচীন পুরাণকথায় বর্ণিত আছে, কৈলাশে শিব-পার্বতীর সংসার খুবই আনন্দের ছিল, কিন্তু শিবের ভিক্ষুক প্রকৃতি নিয়ে মা পার্বতীর অসন্তোষ ছিল। হিমালয় কন্যা পার্বতী একদিন ক্রোধে পিতার ঘরে ফিরে যান। সখী জয়া-বিজয়ার পরামর্শে তিনি জগতের সমস্ত অন্ন হরণ করেন। ফলে চারিদিকে ক্ষুধার হাহাকার পড়ে যায়। ভিক্ষুক শিব কোথাও খাবার পান না। অবশেষে তিনি অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে হাত পাতেন। দেবী তাঁকে অন্ন দান করেন, এবং শিবের ইচ্ছায় কাশীতে তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই কাহিনী থেকে বোঝা যায়, অন্নপূর্ণার কাছে সকলেই হাত পাততে পারেন—এমনকি দেবাদিদেব মহাদেবও। এটি শেখায় যে, খাদ্য হলো প্রভুর দান, এবং তা বিতরণ করা উচিত। বাংলার লোককথায় এই গল্প প্রচারিত হয়েছে রায়গুণাকরের কাব্যের মাধ্যমে। আজও মূর্তিতে শিবকে অন্ন গ্রহণ করতে দেখা যায়, যা পূজার প্রতীকী অংশ।
অন্নপূর্ণা পূজা (Annapurna Puja) ২০২৬-এর তারিখ ও সময়
২০২৬ সালে (বঙ্গাব্দ ১৪৩২) শ্রী শ্রী অন্নপূর্ণা পূজা (Annapurna Puja) অনুষ্ঠিত হবে ২৬ মার্চ বৃহস্পতিবার। পরের দিনই রামনবমী। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে অষ্টমী তিথি শুরু ২৫ মার্চ দুপুর ১:৫২ থেকে ২৬ মার্চ সকাল ১১:৪৯ পর্যন্ত। গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা মতে শুরু ২৫ মার্চ বিকেল ৪:৪৭ থেকে ২৬ মার্চ দুপুর ২:২৮। এই তারিখগুলো কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের জন্য প্রযোজ্য।
বাসন্তী পূজার অষ্টমীতে এই পূজা হয়, যা চৈত্র নবরাত্রির অংশ। পঞ্জিকা অনুসারে পূজা মুহূর্ত সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে রাখাই উত্তম।
অন্নপূর্ণা পূজার বিধি এবং নিয়ম (পদ্ধতি)
পূজা শুরু করার আগে ঘর পরিষ্কার করুন এবং স্নান করে শুদ্ধ হোন। লাল কাপড়ের উপর কলশ স্থাপন করুন, তার উপর আমপাতা ও নারকেল। অন্নপূর্ণা মূর্তি বা ছবি রাখুন। ধূপ-দীপ জ্বালান, চন্দন-ফুল অর্পণ করুন। ভোগ হিসেবে খিচুড়ি, দুধ-ভাত, ফলমূল দিন। অন্নপূর্ণা সহস্ত্রনাম স্তোত্র পাঠ করুন। মন্ত্র: “ওঁ অন্নপূর্ণায়ৈ নমঃ”। অন্ন প্রসাদ বিতরণ করুন এবং দান করুন।
-
সকালে ঘটস্থাপনা।
-
ধূপ-দীপ-নৈবেদ্য অর্পণ।
-
অন্ন বিতরণ করে আরতি।
-
দরিদ্রকে খাবার দান।
এই বিধি ঘরোয়া পূজার জন্য সহজ।

বাংলায় অন্নপূর্ণা পূজার ইতিহাস এবং প্রসার
কাশী বিশ্বনাথের দর্শনের আগে অন্নপূর্ণা পূজা (Annapurna Puja) অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। বাবা বিশ্বনাথ কাশীধামের নির্মাতা, মা অন্নপূর্ণা অধিষ্ঠাত্রী। ভারতচন্দ্রের কাব্যের মাধ্যমে এটি বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় এর প্রসারে অগ্রণী ছিলেন। কলকাতার কুমারটুলি, লেক কালীবাড়িতে পূজা হয়।
এই পূজা বাংলার সাংস্কৃতিক অংশ হয়ে উঠেছে। রামনবমীর আগে এটি উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে।
অন্নপূর্ণা পূজার উপকারিতা এবং দোষ-নিষেধ
এই পূজা করে পরিবারে খাদ্যসমৃদ্ধি আসে, সন্তানের কল্যাণ হয়। দান করলে পুষ্টি লাভ। দোষ: অশুদ্ধ খাবার না দেওয়া, দান না করা। উপায়: ভোগ বিতরণ, দরিদ্রদের খাবার দেওয়া।
ভক্তিমূলক মন্ত্র এবং স্তোত্র
-
ওঁ শ্রীং হ্রীং ক্লীং অন্নপূর্ণায়ৈ নমঃ।
-
অন্নপূর্ণা স্তোত্র পাঠ: খাদ্যং ময়ি দে হি গৃহেষু ভব।
এগুলো পূজায় জপ করলে ফল পাওয়া যায়। 
কলকাতায় অন্নপূর্ণা পূজা ২০২৬
কলকাতায় কুমারটুলি, রাজারহাট, লেক কালীবাড়িতে বেশ জাঁকজমক করে অন্নপূর্ণা পূজা (Annapurna Puja) অনুষ্ঠিত হয়। ঘরে পূজা করুন সকালে। প্রস্তুতি: মূর্তি কিনুন, মা অন্নপূর্ণাকে ভোগ নিবেদন করার মাধ্যমে মায়ের কাছে মনোবাসনা প্রকাশ করুন।

পড়ুন বুলেটিন বাংলা ॥ এই ধরনের আরও খবর জানতে