দিনের আলো ছাড়াই তৈরি হচ্ছে অক্সিজেন! গভীর সমুদ্রের এই রহস্য আপনাকে চমকে দেবে

গভীর সমুদ্রের ‘ডার্ক অক্সিজেন(Dark Oxygen)’: বিজ্ঞানীদের চোখ কপালে তোলা এক অভূতপূর্ব আবিষ্কার

আমরা ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের বইতে পড়ে এসেছি—উদ্ভিদ সূর্যালোকের উপস্থিতিতে সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন তৈরি করে। আমাদের বায়ুমণ্ডলের প্রায় অর্ধেক অক্সিজেন আসে সমুদ্রের প্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক উদ্ভিদ থেকে। কিন্তু সম্প্রতি গভীর সমুদ্রের তলদেশে এমন এক ঘটনা আবিষ্কৃত হয়েছে, যা বিজ্ঞানের এই চিরন্তন ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।

সমুদ্রের তলদেশে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছানোর কোনো নামনিশানা নেই, সেখানে সম্পূর্ণ অন্ধকারে তৈরি হচ্ছে অক্সিজেন! বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ডার্ক অক্সিজেন’ (Dark Oxygen)। আসুন জেনে নেওয়া যাক এই রোমাঞ্চকর আবিষ্কার এবং এর পেছনের অবিশ্বাস্য বিজ্ঞান সম্পর্কে।

ডার্ক অক্সিজেন (Dark Oxygen) কী এবং এটি কীভাবে তৈরি হচ্ছে?

স্কটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর মেরিন সায়েন্স (SAMS)-এর অধ্যাপক অ্যান্ড্রু সুইটম্যান (Prof Andrew Sweetman) এবং তাঁর গবেষক দল প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই এবং মেক্সিকোর মধ্যবর্তী ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন জোন (Clarion-Clipperton Zone) নামক অঞ্চলের প্রায় ৫ কিলোমিটার (১৬,০০০ ফুট) গভীরে এই বিস্ময়কর ঘটনাটি প্রথম লক্ষ্য করেন।

সেখানে কোনো উদ্ভিদ নেই, নেই কোনো আলো। তাহলে অক্সিজেন আসছে কোথা থেকে? বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, সমুদ্রের তলদেশে থাকা কিছু বিশেষ ধাতব পিণ্ড বা পলিমেটালিক নুডিউলস (Polymetallic Nodules) এই অক্সিজেন তৈরির কারিগর।

Dark Oxygen

প্রাকৃতিক ব্যাটারির ম্যাজিক: জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ

এই ধাতব নুডিউলগুলো মূলত লিথিয়াম, কোবাল্ট, তামা এবং ম্যাঙ্গানিজের মতো মূল্যবান ধাতু দিয়ে গঠিত, যা তৈরি হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে। এগুলো দেখতে অনেকটা আলু বা পাথরের টুকরোর মতো।

বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখেছেন, এই নুডিউলগুলোর উপরিভাগে প্রায় ১.৫ ভোল্ট পর্যন্ত বৈদ্যুতিক প্রবাহ বা ভোল্টেজ তৈরি হচ্ছে—যা আমাদের ঘরে ব্যবহৃত একটি সাধারণ AA ব্যাটারির ভোল্টেজের সমান!

সহজ ভাষায় বিজ্ঞান: জলের সংকেত হলো $H_2O$। আমরা যখন কোনো ব্যাটারিকে লবণাক্ত জলে রাখি, তখন তার বিদ্যুৎ প্রবাহ জলকে ভেঙে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনে রূপান্তর করে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় তড়িৎ বিশ্লেষণ (Electrolysis) বলা হয়। সমুদ্রের তলদেশে এই ধাতব নুডিউলগুলো একে অপরের সংস্পর্শে এসে ঠিক যেন টর্চের ব্যাটারির মতো কাজ করছে এবং সমুদ্রের জলকে ভেঙে অবিরত অক্সিজেন তৈরি করে চলেছে।

আবিষ্কারের পেছনের চমকপ্রদ ইতিহাস

অধ্যাপক সুইটম্যান ২০১৩ সালে প্রথম এই ঘটনার আভাস পেয়েছিলেন। কিন্তু তখন তিনি নিজেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি। তিনি ভাবেন তাঁর পরিমাপক যন্ত্রটি হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ প্রচলিত বিজ্ঞান বলে—আলো ছাড়া অক্সিজেন তৈরি অসম্ভব!

পরবর্তীতে দীর্ঘ প্রায় এক দশক গবেষণার পর এবং আন্তর্জাতিক জার্নাল Nature Geoscience-এ এই গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে শোরগোল পড়ে যায়।

কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ? (ইউনিক ইনফরমেশন)

এই আবিষ্কারটি শুধুমাত্র একটি নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়, এটি পৃথিবীর ইতিহাস এবং ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে:

  • প্রাণের উৎপত্তি ও বিবর্তন: এতদিন ভাবা হতো পৃথিবীতে প্রথম আলো-নির্ভর সালোকসংশ্লেষণকারী জীবের মাধ্যমে অক্সিজেনের আগমন ঘটেছিল, যার ফলে উন্নত প্রাণীর বিকাশ সম্ভব হয়। কিন্তু এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, আলো ছাড়াও পৃথিবীতে অক্সিজেন তৈরি হওয়া সম্ভব ছিল। অর্থাৎ, পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রাণ হয়তো সমুদ্রের এই ডার্ক অক্সিজেনের ওপর ভর করেই বিকশিত হয়েছিল!

  • ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান: আমাদের সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের উপগ্রহে (যেমন বৃহস্পতির চাঁদ ‘ইউরোপা’ বা শনির ‘এনসেলাডাস’) বরফের নিচে গভীর সমুদ্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। যদি সেখানেও এমন ধাতব নুডিউল থাকে, তবে সূর্যের আলো ছাড়াই সেখানে অক্সিজেন-সমৃদ্ধ পরিবেশ এবং প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব।

গভীর সমুদ্র খনির (Deep-Sea Mining) কালো ছায়া ও পরিবেশগত বিতর্ক

বর্তমানে পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই আবিষ্কার নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ এই ধাতব নুডিউলগুলোতে যে লিথিয়াম, কোবাল্ট ও তামা রয়েছে, তা বর্তমান যুগের বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) এবং স্মার্টফোনের ব্যাটারি তৈরির জন্য অত্যন্ত জরুরি।

বেশ কিছু বহুজাতিক খনি কোম্পানি সমুদ্রের তলদেশ থেকে এই নুডিউলগুলো তুলে আনার জন্য বিশাল বড় বড় যন্ত্র তৈরি করছে।

বিজ্ঞানীরা কেন চিন্তিত?

যুক্তরাষ্ট্রের NOAA (National Oceanic and Atmospheric Administration) এবং বিশ্বজুড়ে ৪৪টি দেশের ৮০০-রও বেশি বিজ্ঞানী এই খনি খনন বন্ধ বা স্থগিত করার জন্য একটি আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক মারে রবার্টস জানান:

“সমুদ্রের তলদেশের এই বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে আমরা এখনো খুব সামান্যই জানি। এই নুডিউলগুলো শুধু ধাতু নয়, এগুলো সেখানকার সামুদ্রিক জীবকুলের বেঁচে থাকার অক্সিজেনের প্রধান উৎস। স্ট্রিপ মাইনিং বা নির্বিচারে খনি খনন করলে এই পুরো ইকোসিস্টেম ধ্বংস হয়ে যাবে।”

Dark Oxygen
এক নজরে ডার্ক অক্সিজেন (Dark Oxygen) ও গভীর সমুদ্রের খনি
বৈশিষ্ট্য তথ্য
আবিষ্কারের স্থান ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন জোন (Clarion-Clipperton Zone), প্রশান্ত মহাসাগর
গভীরতা প্রায় ৫ কিলোমিটার (১৬,০০০ ফুট) নিচে, সম্পূর্ণ অন্ধকারে
মূল উৎস পলিমেটালিক নুডিউলস (লিথিয়াম, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ মিশ্রিত পাথর)
প্রক্রিয়া ভূ-রাসায়নিক তড়িৎ বিশ্লেষণ (Geochemical Electrolysis)
ভোল্টেজ প্রতিটি নুডিউলে প্রায় ১.৫ ভোল্ট (AA ব্যাটারির সমতুল্য)
প্রধান ঝুঁকি গভীর সমুদ্র খনির ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও অক্সিজেন উৎপাদন ব্যাহত হওয়া
আমাদের দায়িত্ব

বলা হয়ে থাকে, আমরা চাঁদের পৃষ্ঠ সম্পর্কে যতটা জানি, আমাদের পৃথিবীর গভীর সমুদ্র সম্পর্কে তার চেয়েও কম জানি। ‘ডার্ক অক্সিজেন (Dark Oxygen)’-এর এই আবিষ্কার প্রকৃতির এক অপার রহস্যের পর্দা উন্মোচন করলো। অধ্যাপক সুইটম্যানের মতে, তারা খনি খননের বিরোধী নন, তবে এই মহামূল্যবান পরিবেশ ধ্বংস করার আগে আমাদের এই ডার্ক অক্সিজেনের উৎস ও এর ওপর নির্ভরশীল জীবজগৎকে আরও গভীরভাবে বুঝতে হবে। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে প্রকৃতির এই অনন্য উপহারকে রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

আরও পড়তে, নতুন নতুন তথ্য জানতে দেখুন বুলেটিন বাংলা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top