বিশ্বের দীর্ঘতম বজ্রপাতের (Lightening) রেকর্ড: ৮২৯ কিলোমিটার জুড়ে একটিমাত্র বিদ্যুৎঝলক
বজ্রপাত (lightning) সাধারণত কয়েক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ঘটে এবং খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ২০১৭ সালের এক বিরল বজ্রঝলক বিজ্ঞানীদের অবাক করে দিয়েছে, কারণ সেটি টানা ৮২৯ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিল এবং আকাশে ছিল ৭.৩৯ সেকেন্ড।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের পূর্বাঞ্চল থেকে মিসৌরির কানসাস সিটির কাছে পর্যন্ত বিস্তৃত এই বজ্রপাতকে (lightning) এখন বিশ্বের দীর্ঘতম মেগাফ্ল্যাশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)। এই ঘটনাটি প্রথমে স্যাটেলাইট তথ্য পুনঃবিশ্লেষণ করে শনাক্ত করা হয়, পরে আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড হিসেবে নিশ্চিত করা হয়।
কবে ও কোথায় ঘটেছিল এই বজ্রপাত (lightning)
এই রেকর্ড বজ্রপাতটি ঘটে ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর, উত্তর আমেরিকার একটি শক্তিশালী ঝড়ো আবহাওয়ার সময়। বজ্রঝলকটি ডালাসের কাছাকাছি শুরু হয়ে কানসাস সিটির দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্তত তিনটি রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত হয়।
পরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি ছিল একটি বিশাল থান্ডারস্টর্ম কমপ্লেক্সের অংশ, যা মিনেসোটা থেকে টেক্সাস পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এমন বিশাল মেঘগুচ্ছের মধ্যেই বজ্রপাত (lightning) এত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।

মেগাফ্ল্যাশ আসলে কী
অস্বাভাবিক দীর্ঘ বজ্রপাতকে মেগাফ্ল্যাশ বলা হয়। এটি সাধারণ বজ্রপাতের (lightning) মতো শুধু একটি স্থানে আঘাত করে না, বরং মেঘের ভেতর দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত অনুভূমিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই ধরনের বজ্রঝলক খুব বিরল। প্রতি হাজার বজ্রপাতে (lightning)র মধ্যে মাত্র একটি এই রকম বিশাল বিস্তার নিতে পারে, আর সেটিই একে আবহাওয়াবিজ্ঞানের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
কেন এই রেকর্ড এত গুরুত্বপূর্ণ
নতুন রেকর্ডটি শুধু একটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং বজ্রপাত কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য বড় একটি সূত্র। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মেগাফ্ল্যাশ বুঝতে পারলে ঝড়ের আচরণ, বজ্রপাতের বিস্তার এবং ঝুঁকিপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ বজ্রপাত (lightning) একসঙ্গে বহু স্থানে আঘাত হানতে পারে, ফলে গাছপালা, বিদ্যুৎব্যবস্থা, যানবাহন, এমনকি মানুষের জীবনও বিপন্ন হতে পারে। এই কারণেই মেগাফ্ল্যাশকে শুধু বিরল ঘটনা নয়, একটি সম্ভাব্য বিপদ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
কীভাবে তৈরি হয় এই বজ্রপাত
বজ্রগর্ভ মেঘের ভেতরে জলকণা, বরফকণা এবং তুষারকণা পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ করে বিদ্যুৎ আধান তৈরি করে। সেই চার্জ জমে গেলে একটি তীব্র বিদ্যুৎপ্রবাহ তৈরি হয়, যেটিই আমরা বজ্রপাত হিসেবে দেখি।
সাধারণ অবস্থায় এই প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ছোট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বড় মাপের ঝড়ের ক্ষেত্রে মেঘের ভেতরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে বিদ্যুৎ-আধানযুক্ত কণাগুলো অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে এবং বিশাল মেগাফ্ল্যাশ তৈরি হয়।

আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেল
এর আগে ২০২০ সালের একটি বজ্রঝলককে দীর্ঘতম বলে ধরা হতো, যার দৈর্ঘ্য ছিল ৭৬৮ কিলোমিটার। সেটিও যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট প্লেইনস অঞ্চলে ঘটেছিল, যা বজ্রপাতের (lightning) জন্য একটি পরিচিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।
কিন্তু নতুন বিশ্লেষণে ২০১৭ সালের ঘটনাটি আরও বড় প্রমাণিত হয়। ফলে ৭৬৮ কিলোমিটারের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে ৮২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বজ্রঝলক নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়ে।
দীর্ঘস্থায়ী বজ্রপাতের দিক থেকেও অনন্য
দৈর্ঘ্যের পাশাপাশি এই বজ্রঝলক সময়ের দিক থেকেও চমকপ্রদ। ৭.৩৯ সেকেন্ড ধরে স্থায়ী থাকা এমন এক বিদ্যুৎঝলক সাধারণ বজ্রপাতের তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘ।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা দেখায় যে ঝড়ের ভেতরে শক্তির বিস্তার কতটা জটিল হতে পারে। একটি বজ্রপাত শুধু একটি ছোট আলো নয়, বরং কখনও কখনও বিপুল আবহাওয়াগত শক্তির দীর্ঘ প্রতিফলন হয়ে উঠতে পারে।
বিজ্ঞানীরা কী জানতে চাইছেন
গবেষকদের মনে এখন অনেক প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। কেন কিছু ঝড় মেগাফ্ল্যাশ তৈরি করে আর অন্যগুলো করে না, কোন মেঘীয় গঠন এই ধরনের বজ্রপাতকে (lightning) দীর্ঘ করে তোলে, এবং কীভাবে স্যাটেলাইট তথ্য দিয়ে আরও আগেভাগে তা ধরা যায়—এসব নিয়ে গবেষণা চলছে।
এ কারণে এই রেকর্ড শুধু আবহাওয়ার ইতিহাসে নয়, ভবিষ্যতের দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মেগাফ্ল্যাশ সম্পর্কে যত বেশি জানা যাবে, ততই মানুষ ও অবকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখা সহজ হবে।
এই রকমের আর্টিকেল আরও পড়তে দেখুন বুলেটিন বাংলা