চাঁদের মাটিতে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিল অ্যাস্টরয়েড ২০২৪ (Asteroid 2024) ওয়াইআর৪ (YR4) -এর, যা পৃথিবী থেকে আলোর ঝলকানি হিসেবে দেখা যেতে পারত। কিন্তু সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে নাসার জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ নিশ্চিত করেছে যে এটি চাঁদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাবে।

অ্যাস্টরয়েড ২০২৪ (Asteroid 2024) ওয়াইআর৪ (YR4) নামক এই গ্রহাণুটি প্রথম আবিষ্কৃত হয় ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর। চিলির রিও হুর্তাদোতে অ্যাস্টরয়েড টেরেস্ট্রিয়াল-ইমপ্যাক্ট লাস্ট অ্যালার্ট সিস্টেম (অ্যাটলাস) টেলিস্কোপ দিয়ে এটি খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। শুরুতে এটি পৃথিবীর জন্য বিপদের আভাস বলে মনে করা হয়েছিল, কারণ ২০৩২ সালের ২২ ডিসেম্বর এটি পৃথিবীর কাছে আসতে পারে। প্রথম গণনায় পৃথিবীতে আঘাতের সম্ভাবনা ছিল ৩.১ শতাংশ, পরে ১.৫ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু পরবর্তী পর্যবেক্ষণে পৃথিবীর কোনো ঝুঁকি নেই বলে নিশ্চিত হয়েছে।
এই গ্রহাণুটি অ্যাপোলো টাইপের Near Earth Object (NEO), যা পৃথিবীর কক্ষপথের সঙ্গে ছেদ করে। এর আবিষ্কারের পর থেকে নাসা, ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি (ESA) এবং অন্যান্য সংস্থা কড়া নজর রেখেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে টরিনো স্কেলে এটির রেটিং ৩ হয়েছিল, যা বিরল ঘটনা। কিন্তু ধীরে ধীরে আরও তথ্য সংগ্রহ করে ঝুঁকি কমানো হয়েছে।
গ্রহাণুর আকার এবং বৈশিষ্ট্য (Asteroid 2024)
এই গ্রহাণুর আকার প্রায় ৫৩ থেকে ৬৭ মিটার, অর্থাৎ ১৭৪ থেকে ২২০ ফুট, যা ১৫ তলা বাড়ির সমান। আগে অনুমান ছিল ৪০ থেকে ৯০ মিটার। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ইনফ্রারেড পর্যবেক্ষণে এই নির্ভুলতা পাওয়া গেছে। এটি দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে, প্রায় ১৭ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড।
গ্রহাণুর এই আকার এমন যে, পৃথিবীতে আঘাত করলে এটি স্থানীয় এলাকায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতি করতে পারত। তুলনায়, ২০১৩ সালের চেলিয়াবিনস্ক মিটিওর ছিল ২০ মিটার, যা রাশিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। চাঁদে আঘাত হলে এটি ১ কিলোমিটার চওড়া গর্ত তৈরি করতে পারত।

চাঁদে আঘাতের সম্ভাবনা এবং গণনা
শুরুতে চাঁদে আঘাতের সম্ভাবনা ছিল ৪.৩ শতাংশ। নাসার হিসাবে ২০৩২ সালের ২২ ডিসেম্বর এটি ঘটতে পারে। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণে (১৮ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি) এই সম্ভাবনা শূন্য হয়ে গেছে। এখন এটি চাঁদের উপরে ২১,২০০ কিলোমিটার দূরে দিয়ে অতিক্রম করবে।
বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে সৌরজগতের অনুকরণ করেছেন। এতে সূর্য, গ্রহ, চাঁদ এবং গ্রহাণুর গতিপথ অনুসরণ করা হয়েছে। এই মডেলে সম্ভাব্য সংঘর্ষের জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে আরও তথ্য আসতে পারে।
সম্ভাব্য সংঘর্ষের প্রভাব
যদি সংঘর্ষ ঘটত, তাহলে বিস্ফোরণের শক্তি ৬.৫ মিলিয়ন টন টিএনটি সমান হতো। এটি আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় চন্দ্র সংঘর্ষ হতো, ২০১৩ সালেরটির চেয়ে ১০ লক্ষ গুণ শক্তিশালী। পৃথিবী থেকে খোলা চোখে আলোর ঝলক দেখা যেত।
সংঘর্ষে ১০০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম চন্দ্রশিলা পৃথিবীতে ছিটকে আসতে পারত, যা ‘সুপার মিটিওর স্টর্ম‘ তৈরি করত ২ থেকে ১০০ দিন পর্যন্ত। স্যাটেলাইটগুলোর ঝুঁকি থাকত এবং পৃথিবীর একাংশে উল্কাবৃষ্টি হতে পারত। তবে চাঁদের কক্ষপথ বা পৃথিবীতে কোনো বড় প্রভাব পড়ত না।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন সংঘর্ষ বিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব এবং রসায়ন অধ্যয়নের ক্ষেত্র এক নতুন অধ্যায় তৈরী করতো।
পৃথিবীর উপর প্রভাব এবং নিরাপত্তা
ভাগ্যক্রমে, পৃথিবীতে কোনো ঝুঁকি নেই। বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত করেছেন যে সংঘর্ষ হলেও পৃথিবী অক্ষত থাকত। এটি প্ল্যানেটারি ডিফেন্সের জন্য শিক্ষণীয় হতো।
অতীতের গ্রহাণু সংঘর্ষ এবং গুরুত্ব
অতীতে গ্রহাণু পৃথিবীর বিবর্তনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ডাইনোসরের বিলুপ্তির পিছনে ১০ কিলোমিটার গ্রহাণুর আঘাত দায়ী। সাম্প্রতিককালে চেলিয়াবিনস্ক ঘটনা উদাহরণ। এই ঘটনা থেকে আমরা গ্রহাণু প্রতিরোধের প্রযুক্তি শিখতে পারি, যেমন নাসার ডার্ট মিশন।

ভবিষ্যত পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণা
এখন গ্রহাণুটি নিরাপদে এগিয়ে চলেছে। NASA এবং ESA আরও পর্যবেক্ষণ করবে। এটি প্ল্যানেটারি ডিফেন্স বাড়াতে সাহায্য করবে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া যাবে।
এরকম আরও জানতে দেখুন বুলেটিন বাংলা