চাঁদের আকর্ষণে মন্থর হচ্ছে পৃথিবী: ঘূর্ণন গতি কমছে, ২৫ ঘণ্টার দিন আসতেই পারে!
পৃথিবীর ঘূর্ণন (Earth Rotation) গতি কমছে—এই খবর শুনে অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে। বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর গ্রহের আবর্তন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, আমাদের নীল গ্রহটি ধীরে ধীরে গতি হারাচ্ছে। এর পিছনে মূল খেলোয়াড় চাঁদ। চাঁদের মহাকর্ষীয় টানে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে, এবং দূর ভবিষ্যতে ২৫ ঘণ্টার দিনও অসম্ভব নয়। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি কেন কমছে, চাঁদের ভূমিকা এবং এর প্রভাব সম্পর্কে।

দৈনন্দিন জীবনে ২৪ ঘণ্টার দিন: কিন্তু বাস্তবে কী?
আমরা সবাই জানি, একটি দিনে ২৪ ঘণ্টা। ছোটবেলায় স্কুলের খাতায় এই সরল হিসাব শিখেছি। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এত সহজ নয়। পৃথিবী নিজের অক্ষের চারপাশে ঘুরতে সময় নেয় মাত্র ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ৪ সেকেন্ড। এই সময়কে বলা হয় ‘সিডেরিয়াল ডে’। সূর্যের সাপেক্ষে দিন ২৪ ঘণ্টা হয় কারণ পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরতে গিয়ে অতিরিক্ত ৪ মিনিট সময় নেয়।
এই হিসাব মেলানোর জন্য প্রতি চার বছর অন্তর আমরা অধিবর্ষ (লিপ ইয়ার) যোগ করি, যাতে বছরে ৩৬৬ দিন হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থাও চিরস্থায়ী নয়। পৃথিবীর ঘূর্ণন (Earth Rotation) গতি কমছে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন। প্রতি শতাব্দীতে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ে প্রায় ১.৭ মিলিসেকেন্ড। এই পরিবর্তন ছোট মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিশাল প্রভাব ফেলে। যদি চাঁদের প্রভাবে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে এভাবে চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ঘড়ির নিয়ম বদলাতে হতে পারে।
চাঁদের মহাকর্ষ: পৃথিবীর গতির (Earth Rotation) প্রধান ‘ব্রেক’
চাঁদ আমাদের একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ, এবং এর প্রভাব অপরিসীম। চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীর ঘূর্ণন (Earth Rotation) গতি কমছে—এই তত্ত্ব বিজ্ঞানীদের মধ্যে জনপ্রিয়। চাঁদের মহাকর্ষ বলে সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা হয়। বিশাল জলরাশি উঠে আসে, কিছুক্ষণ পর আবার নেমে যায়। এই ওঠানামায় সমুদ্রতলের সঙ্গে ঘর্ষণ সৃষ্টি হয়, যা পৃথিবীর ঘূর্ণনকে ধীর করে দেয়।
কল্পনা করুন, একটি ঘূর্ণায়মান চাকা। আপনি হালকা করে পা দিয়ে ঘর্ষণ করলে তার গতি কমে যায়, কিন্তু থেমে যায় না। ঠিক তেমনি চাঁদের টানে পৃথিবীর গতি মন্থর হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় চাঁদও ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার। এটি ‘টাইডাল ফ্রিকশন’ নামে পরিচিত, যা শক্তির আদান-প্রদানের ফল। NASA-র গবেষণায় দেখা গেছে, এই ঘর্ষণের কারণে পৃথিবীর দিন লম্বা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষণের বিজ্ঞান: লিপ সেকেন্ডের ভূমিকা
আমরা দৈনন্দিন জীবনে এই পরিবর্তন অনুভব করি না, কারণ এটি সেকেন্ডের অতি ক্ষুদ্র অংশ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা অতি সূক্ষ্ম যন্ত্রের সাহায্যে এটি মাপেন। পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির (Earth Rotation) পরিবর্তন পরিমাপ করতে তারা নক্ষত্রের সাপেক্ষে হিসাব করে। ঐতিহাসিক রেকর্ড, যেমন প্রাচীন গ্রহণের সময় নোট থেকে বর্তমান অ্যাটমিক ঘড়ির তুলনা করা হয়।
এর ফলে লিপ সেকেন্ড যোগ করতে হয়। এটি পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং ঘড়ির সময় মেলানোর জন্য একটি অতিরিক্ত সেকেন্ড। আমেরিকার নৌ পর্যবেক্ষণ ঘাঁটি (USNO) এবং আন্তর্জাতিক পৃথিবী ঘূর্ণন সেবা (IERS) এই তথ্য প্রকাশ করে। ১৯৭২ সাল থেকে ২৭ বার লিপ সেকেন্ড যোগ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে।

২৫ ঘণ্টার দিন কবে আসবে? হিসাব কী বলে?
বিজ্ঞানীরা হিসাব করে বলছেন, ২৫ ঘণ্টার দিন সম্ভব। কিন্তু কত সময় লাগবে? যদি চাঁদের গতি একই থাকে, তাহলে প্রায় ২০ কোটি বছর পর একটি দিন ২৫ ঘণ্টা হবে। এটি মানবসভ্যতার জন্য কোনও চিন্তার বিষয় নয়, কারণ ততদিনে সূর্যই লাল জায়ন্ট হয়ে আমাদের গ্রাস করবে। তবু, এই তথ্য ভবিষ্যতের সময় ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা জাগায়।
প্রাচীনকালে দিন ছিল ২২ ঘণ্টারও কম। ৬০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর দিন ছিল মাত্র ২১ ঘণ্টা। এই পরিবর্তনের হার দেখে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে চাঁদই প্রধান কারণ।
চাঁদ ছাড়া অন্যান্য কারণ: জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা
চাঁদের প্রভাবে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে এটাই মূল, কিন্তু অন্যান্য ফ্যাক্টরও আছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরে ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরির কারণে ভরের বিতরণ বদলালে ঘূর্ণন গতি প্রভাবিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরীয় ভূমিকম্পে দিনের দৈর্ঘ্য ২.৬৮ মাইক্রোসেকেন্ড বেড়েছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ উঠছে—এতে পৃথিবীর ভর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায়, যা ঘূর্ণনকে ধীর করে। NASA-র গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলায় দিন ০.৮ মিলিসেকেন্ড লম্বা হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক ঘটনা যেমন ভূমধ্যস্থ মহাসাগরের সংকোচনও প্রভাব ফেলে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা: কী হবে মানুষের সঙ্গে?
দূর ভবিষ্যতে যদি দিন ২৫ ঘণ্টা হয়, তাহলে জীবনযাত্রা বদলে যাবে। ক্যালেন্ডার, ঘড়ি সব আপডেট করতে হবে। জৈবিক ঘড়ি (সার্কেডিয়ান রিদম) প্রভাবিত হবে, যা ঘুম, খাওয়া-দাওয়ায় ফুটে উঠবে। তবে এটি কয়েক কোটি বছর পরের কথা।
বিজ্ঞানীরা এখন AI এবং স্যাটেলাইটের সাহায্যে আরও সঠিক পর্যবেক্ষণ করছেন। GPS এবং কোয়ান্টাম ঘড়ি এই পরিবর্তন ট্র্যাক করছে। পৃথিবীর ঘূর্ণন (Earth Rotation) গতি কমছে কেন জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি জলবায়ু এবং ভূতাত্ত্বিক মডেল তৈরিতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানের অজানা রহস্য
চাঁদের কারসাজিতে পৃথিবী মন্থর হচ্ছে—এই সত্য আমাদের মহাবিশ্বের জটিলতা দেখায়। চাঁদ না থাকলে জোয়ার-ভাটা, জীবনের ভারসাম্য সব বদলে যেত। এই প্রক্রিয়া চলবে, কিন্তু মানুষের জন্য এটি শুধু জ্ঞানের উৎস।
আরও পড়তে ক্লিক করুন এখানে