বেরিঙ প্রণালী থেকে ইউরোপ—চিনের আবিষ্কৃত ‘নর্থ সি রুট’-এ বাণিজ্যের নতুন খেলা

বেরিঙ-প্রণালীর-Bering-strait

বেরিঙ প্রণালীর (Bering strait) বাঁকে নতুন পথ! গলছে বরফে বিশ্ব, খুলছে বাণিজ্যের গুপ্তদ্বার — চিনের ‘আলিবাবার গুহা’, ভারতেরও লাভের সম্ভাবনা

বিশ্ব উষ্ণায়নের হাত ধরে আজ পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে ঘটছে আমূল পরিবর্তন। বরফ গলছে, সমুদ্রের মানচিত্র বদলাচ্ছে, আর এই পরিবর্তনের ভিতরেই চিন খুঁজে পেয়েছে এক অমূল্য বাণিজ্যিক ‘রত্ন’। ইউরোপে পণ্য পাঠানোর জন্য বেজিং আবিষ্কার করেছে সম্পূর্ণ এক নতুন সমুদ্রপথ — নর্থ সি রুট বা উত্তর সামুদ্রিক পথ। এই নতুন রুটের সম্ভাবনা শুধু চিন নয়, ভারতের জন্যও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুমেরু সাগরের বরফ দ্রুত গলছে। সেই বরফ গলার ফলেই এখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে নতুন জলপথ। চিনের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ সম্প্রতি সেই পথ ধরে সাফল্যের সঙ্গে ইউরোপের দিকে এগিয়ে গিয়েছে — মাত্র ছয় দিনে। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই আলোড়ন পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে এই পথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে।

নতুন বাণিজ্যপথের ভৌগোলিক বিস্তার

উত্তর সামুদ্রিক পথের সূচনা রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত বেরিং প্রণালী থেকে। এই প্রণালীর সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ৮৫ কিলোমিটার। চিনা জাহাজগুলি এখান থেকে বাঁদিকে মোড় নিয়ে চুকচি সাগর, পূর্ব সাইবেরিয়া সাগর, ল্যাপতেভ সাগর, কারা সাগর এবং ব্যারেন্টস সাগর পেরিয়ে নরওয়ে সাগরে পৌঁছে যায়। এক কথায়, এই পথ সুমেরু সাগরের বুক চিরে তৈরি হয়েছে।

এই রুট প্রশান্ত মহাসাগরকে সরাসরি সুমেরু সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে ট্রান্স-আর্কটিক এলাকায় রাশিয়ার উত্তর উপকূল ধরে ইউরোপে যাওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে এটি ছোট, জ্বালানি খরচ কম এবং জলদস্যু-মুক্ত একটি পথ।

বেরিঙ-প্রণালীর-Bering-strait

বেরিঙ প্রণালীর (Bering strait):বাণিজ্যিক সুবিধা ও কৌশলগত গুরুত্ব

প্রথাগত সামুদ্রিক রাস্তায় যেমন মালাক্কা, সুয়েজ বা হরমুজ প্রণালীর মতো জায়গায় বাণিজ্য নানা রকম সমস্যায় পড়ে — তেমন কোনো ঝুঁকি নেই এই নর্থ সি রুটে। এতে পরিবহণের সময় ও খরচ দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

সবচেয়ে বড় বিষয়, এই পথে কোনও দেশের শুল্কে বাধা নেই। ফলে পণ্য পরিবহণে চিন আরও বেশি লাভ করতে পারবে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ঝুঁকিও এই পথে নেই, কারণ জলদস্যু বা ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখানে তুলনামূলকভাবে নেই বললেই চলে।

চিন দীর্ঘদিন ধরেই তাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বিকল্প রুটের খোঁজ করছিল। বর্তমান সময়ের মালাক্কা প্রণালী তাদের জন্য এক বড় উদ্বেগের জায়গা। ভারতের আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে অবস্থিত এই প্রণালী দিয়ে চিনের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্রুড অয়েল আসে। ভারত এই অঞ্চলটিতে নৌবাহিনীর টহলদারি বাড়িয়েছে, যা বেজিংকে উদ্বিগ্ন করেছে।

চেক পয়েন্টগুলির কৌশলগত ঝুঁকি

চিনের ইউরোপগামী বাণিজ্য রুটে রয়েছে তিনটি প্রধান চোক পয়েন্ট — মালাক্কা প্রণালী, হরমুজ প্রণালী এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালী। এই প্রত্যেকটি এলাকাই যুদ্ধবিগ্রহ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে অস্থির।

হরমুজ প্রণালী বর্তমানে ইরানের নিয়ন্ত্রণে, বিশেষত আইআরজিসি-র হাতে। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত হলে এই রুট বন্ধ হতে পারে। তাতে চিন শুধু এনার্জি সাপ্লাই নয়, সামগ্রিক বাণিজ্যে ধাক্কা খেতে পারে। বাব এল-মান্দেব প্রণালী ইয়েমেন ও সোমালিয়ার মাঝখানে অবস্থিত, যেখানে হুথি গেরিলা এবং সোমালি দস্যুরা পণ্যবাহী জাহাজ আক্রমণ করে থাকে।

অন্যদিকে সুয়েজ খালও রাজনৈতিক টানাপোড়েন, নাব্য সমস্যা ও দুর্ঘটনার কারণে বারবার বন্ধ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে একটি জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনায় সারাবিশ্বের বাণিজ্যে বিপর্যয় নেমেছিল।

বিকল্প হিসাবে পুরনো রুট ও তাদের সীমাবদ্ধতা

উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope) ঘুরে ইউরোপে যাওয়া একটি ঐতিহ্যবাহী পথ হলেও এটি দীর্ঘতম। এতে শুধু সময়ই নয়, খরচও বেশি।

অন্য একটি সম্ভাবনা ছিল পানামা খাল হয়ে যাওয়া পথ। কিন্তু এই খালের জলস্তর নির্ভর করে মিষ্টি জলের উপর, আর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেখানকার বৃষ্টিপাত কমে গেছে। ফলে ভারী জাহাজের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া, আমেরিকা এই রুটে চিনা জাহাজ চলাচলকে মোটেই স্বাগত জানায় না।

এই সব মিলিয়ে চিন অনেক দিন ধরেই এমন একটি রুটের খোঁজে ছিল, যা আন্তর্জাতিক চাপ ও জলবায়ুগত সমস্যার বাইরে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন: বিপর্যয়ের মধ্যেও সুযোগ

সুমেরু বরফের গলন মানবজাতির জন্য পরিবেশগত বিপদ বয়ে আনছে – সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। কিন্তু বেজিং সেই বিপর্যয়ের মাঝেই খুঁজে নিয়েছে বাণিজ্যের সুবিধা। উত্তর সি রুট এখন তাদের জন্য এক অপূর্ব সুযোগ, কারণ এটি ইউরোপের বাজারে পৌঁছনোর সময় কমিয়ে দিচ্ছে প্রায় ৩০–৪০ শতাংশ।

চিন বর্তমানে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে খনিজ তেল কিনছে। এই নতুন রুট ব্যবহার করে তারা সহজেই সেই তেল নিজেদের বন্দরে আনতে পারবে। ফলে মালাক্কা প্রণালীর উপর নির্ভরতা কমবে এবং অর্থনীতির গতিও ত্বরান্বিত হবে।

ভারতের জন্য নতুন সম্ভাবনা

চিনের পাশাপাশি ভারতও এই নতুন বাণিজ্যপথ ব্যবহার করতে পারে। গত বছর ভারত শুরু করেছে ‘চেন্নাই–ভ্লাদিভস্তক মেরিটাইম করিডোর’। এটি ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধির নতুন অধ্যায়। এই পথে সুয়েজ রুটের তুলনায় প্রায় ৫,৬০০ কিলোমিটার পথ কম লাগে, যা সময় ও খরচ উভয়ই বাঁচায়।

ভ্লাদিভস্তক থেকে বেরিঙ প্রণালীর (Bering strait) দূরত্ব খুব বেশি নয়, ফলে ভারতীয় জাহাজও উত্তর সি রুটে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে পারবে। তবে এখানেও কিছু রাজনৈতিক প্রশ্ন রয়ে গেছে। এই পথের অধিকাংশ অংশ রাশিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে পড়ে, তাই বিদেশি জাহাজ চলাচলের অনুমতিতে ক্রেমলিন কতটা উদার হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আপত্তি

এই রুটের আরেকটি সম্ভাব্য বিতর্ক আমেরিকার সঙ্গে। কারণ, বেরিং প্রণালীর কাছেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলাস্কা প্রদেশ। সেখানে রয়েছে কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি, যা মার্কিন প্রতিরক্ষার অংশ। ফলে সেখানে চিনা পণ্যবাহী জাহাজের নিয়মিত উপস্থিতিতে ওয়াশিংটন নিশ্চয় উদ্বিগ্ন হবে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখানেও তৈরি হতে পারে।

পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের বাণিজ্য

বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সৃষ্টি হওয়া এই নতুন সমুদ্রপথ একদিকে যেমন পরিবেশগত বিপদের সংকেত, অন্যদিকে এটি বাণিজ্যিক বাস্তবতার নতুন যুগের সূচনা করছে। পরিবেশবিদরা এই রুট ব্যবহারে সতর্ক থাকতে বলছেন, কারণ বরফ গলার গতি আরও বাড়লে সুমেরু অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হয়ে পড়বে।

তবুও, বাণিজ্যের যুক্তিতে চিন ও রাশিয়া ইতিমধ্যেই যৌথভাবে এই পথের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। রাশিয়া বরফভেদী জাহাজ নির্মাণে বিশ্বের নেতা, আর চিন এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর বাণিজ্যিক রূপ দিতে চায়।

বেরিঙ-প্রণালীর-Bering-strait

উপসংহার: বরফ গলার মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্যের নতুন দিক

বরফ গলে যাচ্ছে, কিন্তু তার নিচে উন্মোচিত হচ্ছে পৃথিবীর নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। উত্তর সি রুট শুধু সমুদ্রপথ নয়, আগামী শতাব্দীর বাণিজ্য যুদ্ধের নতুন ফ্রন্টলাইন হতে যাচ্ছে।

চিন ইতিমধ্যেই সেই যুদ্ধে এগিয়ে — কিন্তু ভারতও পিছিয়ে নেই। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, রাশিয়ার নীতি ও আমেরিকার অবস্থান মেলাতে পারলে এই রুট দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতেও নবজাগরণ আনতে পারে।

উত্তর সামুদ্রিক রাস্তা তাই শুধু এক সমুদ্রপথ নয় — এটি পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের নতুন মানচিত্র, যেখানে বিশ্ব উষ্ণায়নের কুপ্রভাবেই লিখিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়।

আরও খবর পড়তে দেখুন বুলেটিন বাংলা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top