আলোর উৎসব দীপাবলি শুরু হোক ধনতেরাসে—সমৃদ্ধি, শুভশক্তি ও সোনালী ভাগ্যের প্রত্যাবর্তন!

‘দীপাবলি’ বা ‘দিওয়ালি’ আমাদের দেশের অন্যতম মহা উৎসব, যা আলোর উৎসব হিসেবেও পরিচিত। এই উৎসবের মর্মেই রয়েছে মন্দের উপর ভালো, অন্ধকারের উপর আলোর বিজয়। প্রতিবছর কার্তিক মাসে ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলে ওঠে, রঙে রঙে সাজে উঠোন, আর প্রতিটি মানুষের মধ্যে জাগে নতুন আনন্দ ও আশার আলো। হিন্দু ধর্ম মতে, ১৪ বছরের বনবাস শেষে ভগবান রাম যখন অযোধ্যায় ফিরে আসেন, সেই স্মৃতিতেই দীপাবলি উদযাপিত হয়। তবে দীপাবলি শুধুই একদিন নয়, এটি পাঁচ দিনের উৎসব যার সূচনা হয় ‘ধনতেরাস’ দিয়ে।

ধনতেরাস: দীপাবলির সূচনাপর্ব

ধনতেরাস’ বা ‘ধন ত্রয়োদশী’ হিন্দু সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনেই দীপাবলির আসল সূচনা ঘটে। হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে পালিত হয় এই শুভ উৎসব। ‘ধন’ অর্থ সম্পদ আর ‘তেরাস’ মানে ত্রয়োদশ দিন। ফলে এই দিন সম্পদের দেবী লক্ষ্মী এবং ধনদেবতা কুবেরের পূজায় মানুষেরা নিজেদের ঘর-গৃহস্থলীকে সমৃদ্ধ করতে চান।

সাধারণ বিশ্বাস, ধনতেরাসে যদি কেউ নতুন সোনা, রূপা, পিতল বা তামার কোনও দ্রব্য কেনেন, তবে তা বহু গুণ বৃদ্ধি পায় এবং ঘরে আসে আর্থিক উন্নতি। ধনতেরাসের দিন অনেক পরিবারে দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান ধন্বন্তরীর আরাধনা করা হয়। কারণ পুরাণ মতে, এই দিনে সমুদ্র মন্থন থেকে দেবী লক্ষ্মী এবং আয়ুর্বেদের দেবতা ধন্বন্তরীর আবির্ভাব হয়েছিল।

ধনতেরাস

ধন্বন্তরীর আবির্ভাব ও ধনতেরাসের পৌরাণিক গুরুত্ব

ধন্বন্তরী দেবতা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে, তিনি হাতে অমৃত ভরা কলস নিয়ে সমুদ্র মন্থন থেকে আবির্ভূত হন। সেই কলসই মানবজীবনে অমৃত, অর্থাৎ দীর্ঘায়ু ও স্বাস্থ্যসম্মৃদ্ধ জীবনদান করে। তাই এই দিনে নতুন বাসনপত্র বা কলস কেনা অত্যন্ত শুভ হিসাবে বিবেচিত হয়।

আরেক জনপ্রিয় কিংবদন্তি হলো রাজা হিমা এবং তার পুত্রের কাহিনি। রাজপুত্রের জন্মপত্রিকায় নির্ধারিত ছিল, বিবাহের চতুর্থ দিনেই সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হবে। কিন্তু রাজবধূ বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে সেই ভাগ্য বদলে দেন। বিবাহের চতুর্থ দিনে তিনি ঘরের চারদিকে দীপ সাজিয়ে রাখেন, গয়না ও সোনার ঝলমলে আলোয় চারপাশ ঘিরে ফেলেন। ফলে মৃত্যুর দেবতা যম সাপের রূপে এসে আলোর ঝলকে বিভ্রান্ত হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতে পারেননি, এবং সেইভাবেই রাজপুত্রের প্রাণ রক্ষা হয়। এই ঘটনাই ‘যমদীপ’ প্রথার সূচনা করে—যা আজও ধনতেরাসের দিনে পালন করা হয়।

যমদীপ প্রথা

ধনতেরাসের সন্ধ্যাকালে প্রদোষকালে ‘যমদীপ’ জ্বালানোর প্রচলন রয়েছে। এর অর্থ, যমরাজের উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং অকালমৃত্যু থেকে পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করা। এই প্রদীপ সাধারণত বাড়ির বাইরে বা মূল প্রবেশপথের কাছে রাখা হয়।

ধনতেরসের সময় ও শুভক্ষণ

ধনতেরাসের পূজা সাধারণত কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে প্রদোষকাল অর্থাৎ সন্ধ্যাকালে সম্পন্ন হয়। প্রদোষকাল ও ত্রয়োদশী তিথির যোগফলই এই পুজোর শুভক্ষণ। এই সময় লক্ষ্মী পূজা, ধন্বন্তরী পূজা এবং কুবের পূজা বিশেষভাবে ফলপ্রদ।

ধনতেরাসে কেন নতুন দ্রব্য কেনা জরুরি

পুরাণ অনুযায়ী, ধনতেরাস অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য ও সুস্থতার প্রতীক। এই দিন সোনা, রূপা, বাসনপত্র, পিতল, তামা, এমনকি ছোটখাটো গৃহস্থালি দ্রব্য কেনা শুভ মনে করা হয়। মাঝারি বা নিম্ন আয়ের পরিবারও এই দিনে তাদের সাধ্য অনুযায়ী কিছু না কিছু নতুন দ্রব্য ক্রয় করে থাকে, যা শুভ সংকল্পের প্রতীক।

বলা হয়, এই দিনে কোনও সম্পদ বা ধাতব দ্রব্য কেনা মানে দেবী লক্ষ্মীকে আহ্বান করা। তাই ব্যবসায়ী শ্রেণির কাছে ধনতেরাসের দিন অত্যন্ত মূল্যবান। অনেক ব্যবসায়ী এদিনকে নতুন অর্থবর্ষের সূচনাও মনে করেন এবং নতুন হিসাব বই শুরু করেন।

ব্যবসায়ীদের ধনতেরাস

ভারতের নানা প্রদেশে ধনতেরাসে ব্যবসায়ীরা নতুন পণ্যের ক্রয়, পরিবহন ও বিক্রয় শুরু করেন। তারা বিশ্বাস করেন, এই দিনে নতুন ব্যবসা বা লেনদেন শুরু করলে সারা বছর সমৃদ্ধি বজায় থাকবে। তবে বাংলার ক্ষেত্রে, অনেক বাঙালি ব্যবসায়ী তাদের অর্থবর্ষ শুরু করেন পয়লা বৈশাখে, তবু ধনতেরাসে তারা দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করেন।

ধনতেরাসে কী কিনবেন না

এই দিনে সব ধরণের জিনিস কেনা শুভ নয়। শাস্ত্রমতে, কিছু নিষিদ্ধ দ্রব্য ক্রয় এড়ানো উচিত:

  • লোহার বা স্টিলের বাসনপত্র কিনবেন না।

  • খালি কলসি বা হাঁড়ি বাড়িতে আনবেন না, আগে জল ভর্তি করুন।

  • ছুরি-কাঁচি বা ধারালো বস্তু কিনবেন না।

  • কালো রঙের কোনও বস্তু ক্রয় করা অশুভ বলে বিবেচিত।

  • তেল-ঘি জাতীয় দ্রব্য এদিন কিনবেন না।

  • গাড়ি কিনতে হলে দাম আগের দিন পরিশোধ করুন।

  • কাঁচের দ্রব্য এড়িয়ে চলুন।

  • নকল সোনা বা গোল্ড-প্লেটেড গয়না একদমকিনবেন না।

কী কিনবেন

এই শুভ দিনে মঙ্গলকর দ্রব্যগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • তামা কিংবা পিতলের বাসন, যা ঘরের পূর্বদিকে রাখা শ্রেয়।

  • রূপার বাসনপত্র কিনে ঠাকুর ঘরে নিবেদন করুন।

  • ঝাড়ু কেনাও শুভ, যা দারিদ্র্য দূর করে।

  • বৈদ্যুতিক সামগ্রী যেমন মোবাইল, ফ্রিজ বা ওভেন কিনলে তা উত্তর-পশ্চিম দিকে রাখুন।

  • ব্যবসায়ীরা অ্যাকাউন্ট বই বা রেজিস্টার কিনে অফিসের পশ্চিম দিকে রাখেন।

  • পড়ুয়ারা নতুন কলম কিনতে পারেন।

  • রান্নার পেশাদার কারিগররা রান্নার নতুন সরঞ্জাম কেনেন।

  • সোনা বা রূপার লক্ষ্মী-গণেশের কয়েন কেনা অত্যন্ত শুভ।

যাঁদের পক্ষে সোনার কয়েন কেনা সম্ভব নয়, তাঁরা লক্ষ্মী-গণেশের ছবি কিনে শ্রীসূক্ত পাঠ করতে পারেন। বাড়ির মূল দরজায় স্বস্তিক চিহ্ন আঁকলে সৌভাগ্য বৃদ্ধি হয়। গোমতী চক্র হলুদ কাপড়ে মুড়ে আলমারি বা লকারে রাখলে তা শুভফল দেয়।

ধনতেরাসে সৌভাগ্য বর্ধনের নিয়ম

ধনতেরাসে কেবল কেনাকাটা করলেই হবে না, কিছু ঘরোয়া নিয়মও মেনে চলতে হয়:

  • সকালে গোটা বাড়ি ভালোভাবে পরিষ্কার করে সাজাতে হবে।

  • মূল প্রবেশদ্বারে রঙ্গোলী দিন।

  • লক্ষ্মীর পায়ের চিহ্ন এঁকে দেবীকে আহ্বান করুন।

  • যমরাজের উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালিয়ে অকাল মৃত্যু থেকে মুক্তির প্রার্থনা করুন।

  • নতুন কলসে কিছু চাল, সুপারি, ১৩ পদ্মবীজ, গঙ্গাজল, ফুল ও নতুন গয়না দিয়ে পূজা সম্পন্ন করুন।

ধনতেরাস পালন করার উদ্দেশ্য

এই দিন পালন করার কারণ বহুমুখী—

  1. পরিবারের সব সদস্যের সুস্বাস্থ্য কামনায়।

  2. অকালমৃত্যু প্রতিরোধের আশায়।

  3. আর্থিক সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনায়।

  4. দেবী লক্ষ্মী ও ধনদেব কুবেরের আশীর্বাদ লাভে।

  5. দারিদ্র্য দূর করে শান্তিময় জীবন প্রাপ্তিতে।

রাশি অনুযায়ী কী ধাতু কিনবেন

জ্যোতিষশাস্ত্রমতে প্রতিটি রাশির জন্য আলাদা ধাতু শুভ:

  • মেষ রাশি: অল্প পরিমাণ সোনা কিনুন।

  • বৃষ রাশি: রূপা ও সাদা ধাতু মঙ্গলজনক।

  • মিথুন রাশি: দেরি হওয়া কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য রূপা কিনুন।

  • কর্কট রাশি: অর্থ অপচয় রোধে পিতল কিনুন।

  • সিংহ রাশি: হলুদ ধাতু অর্থাৎ সোনা বা পিতল উপযুক্ত।

  • কন্যা রাশি: চাকরির স্থিতিশীলতার জন্য সোনার কয়েন।

  • তুলা রাশি: সোনার বা রূপার কয়েন আপনার সৌভাগ্য বজায় রাখবে।

  • বৃশ্চিক রাশি: পিতল কিনুন।

  • ধনু রাশি: রূপার কয়েন বা বাসন কিনুন।

  • মকর রাশি: বিবাহ ও প্রেমজন শুভ রাখতে রূপা।

  • কুম্ভ রাশি: বিদেশ যাত্রার সাফল্যের জন্য পিতল।

  • মীন রাশি: শারীরিক সুস্থতার জন্য রূপার কয়েন ঠাকুর ঘরে রাখুন।

ধনতেরাস

ধর্মীয় ও সামাজিক তাৎপর্য

ধনতেরাস শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সামাজিকভাবে সম্পদ, স্বাস্থ্য ও আশার প্রতীক। এই দিনে মানুষ অন্যদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে দেয়, উপহার আদান-প্রদান করে, রঙ্গোলী আঁকে এবং চারপাশ আলোকিত করে। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ এই দিনে নিজেদের সামর্থ্য অনুসারে উৎসব পালন করেন। ধনতেরাস সম্প্রতি বাঙালিদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা ভারতের সাংস্কৃতিক ঐক্যের পরিচায়ক।

ধনতেরাস মানেই শুধুমাত্র অর্থ নয়—এই দিন প্রতিটি পরিবারে আলো, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার প্রতীক জ্বলে ওঠে। মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদে প্রতিটি ঘরে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজ করে। তাই দীপাবলির আগের এই দিন, ধর্মপ্রাণ মানুষদের কাছে অপরিসীম তাৎপর্য বহন করে।


এই রকমের আরও খবর পড়তে দেখুন বুলেটিন বাংলা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top