নাসার গবেষণা জানাচ্ছে – ভিনগ্রহীরা (Alien) হয়তো এই মুহূর্তেই আমাদের শুনছে
পৃথিবীর মানুষের কণ্ঠস্বর, প্রযুক্তির তৈরি সিগন্যাল কিংবা মহাকাশগামী যন্ত্রগুলোর জন্য পাঠানো বার্তা হয়তো আমাদের গ্রহের বাইরের কোনো অজানা সভ্যতা আসলেই শুনছে! আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অর্থায়নে পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ এই তথ্য। গবেষকরা বলছেন, যখন আমরা আমাদের মহাকাশযান বা রোভারকে বার্তা পাঠাই, তার সবটুকু শক্তি গন্তব্য গ্রহ বা যানে পৌঁছায় না। বরং এর একটি অংশ মহাশূন্যে ভেসে যায় এবং আলো বা রেডিও তরঙ্গের মতো দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়ে। এই সিগন্যালগুলো হয়তো বিলিয়ন বছর ধরে মহাবিশ্বে ভেসে বেড়াবে, আর সঠিক স্থানে অবস্থান করা কোনো ভিনগ্রহী (Alien) সভ্যতা এগুলো সহজেই ধরতে পারবে।
ভিনগ্রহীরা (Alien) কীভাবে আমাদের শুনতে পারে?
গবেষণা অনুযায়ী, মানুষ প্রধানত মঙ্গল গ্রহ, বৃহস্পতি বা চাঁদে পাঠানো রোভার ও স্যাটেলাইটের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে থাকে। এই যোগাযোগের জন্য যে রেডিও সিগন্যাল পাঠানো হয়, তার অনেকটাই সেই নির্দিষ্ট যন্ত্রে পৌঁছালেও সামান্য অংশ ফেঁসে যায়। উদাহরণস্বরূপ, মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে থাকা একটি রোভারকে আমরা সিগন্যাল পাঠালে, তার সবটাই মঙ্গলে থেমে যায় না। বরং একাংশ মহাশূন্য অতিক্রম করে এগিয়ে চলে যায়।
নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি এবং পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, এই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া রেডিও তরঙ্গের ভ্রমণ শেষ হওয়ার নাম নেই। মহাশূন্যে কোনো দূরবর্তী গ্রহ বা উন্নত ভিনগ্রহী (Alien) প্রযুক্তি থাকলে তারা সহজেই এই সিগন্যাল আটকাতে পারে।
গবেষণার প্রথম লেখক, পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের গবেষক পিনচেন ফান বলছেন –
“আমরা মহাকাশ রোভারের সঙ্গে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ করি। কিন্তু মঙ্গল বা অন্য কোনো গ্রহ আমাদের পুরো বার্তাটিকে আটকে দিতে পারে না। ফলে, মহাকাশের কোনো জায়গা দিয়ে সেই সিগন্যাল ফাঁস হয়ে যায়। যদি সেই পথে কোনো উন্নত জীব বা তাদের যন্ত্র থাকে, নিশ্চয়ই তারা সেটা ধরতে পারবে।”
কেবল একপাক্ষিক নয়, হতে পারে দ্বীপাক্ষিক যোগাযোগ
নাসার গবেষকরা মনে করছেন, যদি সত্যিই কোনো ভিনগ্রহী (Alien) সভ্যতা থেকে থাকে, তাহলে তারা হয়তো আমাদের মতোই তাদের রোভার বা স্যাটেলাইটে বার্তা পাঠায়। আর সেগুলোও মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে পৃথিবী থেকেও সেগুলো শনাক্ত করে আমরা ভিনগ্রহী (Alien) অস্তিত্বের প্রমাণ পেতে পারি। অর্থাৎ, যোগাযোগের সম্ভাবনা একমুখী নয়, বরং দ্বিমুখী।
গবেষণা থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান
এই গবেষণা Astrophysical Journal Letters-এ প্রকাশিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে – গত ২০ বছরের তথ্যের ভিত্তিতে যদি কোনো ভিনগ্রহী (Alien) সভ্যতা পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহের সারিবদ্ধ অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে থাকে, তবে তাদের পক্ষে আমাদের প্রেরিত অন্তত একটি সিগন্যাল ধরার সম্ভাবনা ৭৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, পৃথিবী ও সৌরজগতের অন্য কোনো গ্রহের (যেমন শুক্র বা বৃহস্পতি) সারিবদ্ধ অবস্থার সময় ভিনগ্রহীরা যদি দেখত, তবে সেই সম্ভাবনা দাঁড়ায় প্রায় ১২ শতাংশ। তবে যখন কোনো সারিবদ্ধতা থাকে না, তখন এই সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে।
এটি স্পষ্ট করে যে, মহাকাশে সঠিক স্থানে সঠিক সময় উপস্থিত থাকলেই কেউ আমাদের মহাকাশ বার্তা শুনতে পারে।

ভিনগ্রহীদের (Aliens) অনুসন্ধানে নতুন চিন্তাধারা
এখন পর্যন্ত ভিনগ্রহী (Alien) জীব খোঁজার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা প্রধানত দুটি পদ্ধতিই ব্যবহার করেছেন –
-
দূরবর্তী গ্রহে কৃত্রিম আলোর চিহ্ন
-
রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে কৃত্রিম সিগন্যাল অনুসন্ধান
কিন্তু নাসার এই গবেষণা সামনে এনে দিল এক নতুন দৃষ্টিকোণ। আর তা হলো – আমরা যখন মহাকাশযানকে সিগন্যাল পাঠাই, তখন যে অতিরিক্ত রেডিও তরঙ্গ মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে, সেটা হয়তো ভিনগ্রহীরা (Aliens)শুনছে। তাই উল্টোভাবে বসে আমাদেরও উচিত গ্রহগুলোর সারিবদ্ধ অবস্থায় মহাকাশের নির্দিষ্ট দিকগুলিতে নজর দেওয়া। সেখানেই হয়তো আসল রহস্য লুকিয়ে আছে।
মানুষের মহাকাশ সম্প্রচার: নতুন দিগন্ত
আজ থেকে প্রায় একশত বছরেরও বেশি সময় আগে বিজ্ঞানীরা প্রথমবার রেডিও আবিষ্কার করেছিলেন। তখন থেকেই মানবজাতি অনিচ্ছাকৃতভাবে মহাবিশ্বে সিগন্যাল প্রেরণ করছে। টেলিভিশন স্টেশনের সম্প্রচার, রেডিও স্টেশন কিংবা সামরিক যোগাযোগগুলো পৃথিবীর আকাশ ভেদ করে মহাশূন্যে পৌঁছে যায়। তাই অনেক দিন ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে ধারণা আছে – আমরা চাই কিংবা না চাই, পৃথিবী আসলে মহাবিশ্বের কাছে “শব্দযুক্ত একটি গ্রহ”।
এখনকার গবেষণা এতদিনের ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে দিল। কারণ, এবার আর শুধুই অনিচ্ছাকৃত সম্প্রচার নয়, বরং আমাদের উদ্দেশ্যমূলক মহাকাশ মিশনের সিগন্যালও ভিনগ্রহীর (Alien) কানে যেতে পারে।
ভিনগ্রহী (Alien) জীব খোঁজার গুরুত্ব
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাবিশ্বের যতো বিশালতা, তাতে পৃথিবীর বাইরেও অবশ্যই কোনো না কোনো জীবন থাকা সম্ভব। শুধু আমাদের সৌরজগতেই কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে – যেমন ইউরোপা (বৃহস্পতির উপগ্রহ), এনসেলাডাস (শনি গ্রহের উপগ্রহ) কিংবা টাইটান। যদি এখানে সহজ জীবের অস্তিত্ব থাকতে পারে, তবে বহির্জগতের কোনো এক গ্যালাক্সিতে উন্নত সভ্যতার অস্তিত্ব থাকা অস্বাভাবিক নয়।
এই কারণে, পৃথিবীর সিগন্যালকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনা ভিন্নরকম উৎসাহ জাগাচ্ছে।
ভিনগ্রহীরা (Aliens) যদি সত্যিই আমাদের শুনছে?
এখন প্রশ্ন হলো – যদি কোনো উন্নত সভ্যতা সত্যিই আমাদের সিগন্যাল শুনে থাকে, তবে তারা কি কোনো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে? অথবা ভবিষ্যতে জানাতে পারে? যদিও এখনো পর্যন্ত এ ধরনের কোনো নিশ্চয় প্রমাণ আমরা পাইনি, কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন, প্রয়োজন হলে ভিনগ্রহীরাও (Aliens) হয়তো একদিন সংযোগ করবে।
তবে এর সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। কারা আমাদের শুনছে, তারা কেমন প্রকৃতির – তা তো আমরা জানি না। অতএব, ভিনগ্রহীদের (Aliens) সঙ্গে যোগাযোগ একদিকে যেমন বিজ্ঞানী এবং মানবজাতির বড় জয় হতে পারে, অন্যদিকে তেমনি অজানা বিপদও বয়ে আনতে পারে।
বিজ্ঞানীদের পরবর্তী পরিকল্পনা
এই গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এখন বেশি করে মনোযোগ দিচ্ছেন পর্যবেক্ষণযোগ্য সারিবদ্ধ অবস্থার ওপর। যখন পৃথিবী ও অন্য গ্রহ এক সরলরেখায় আসে, তখন মহাকাশের নির্দিষ্ট অংশ শক্তিশালী সিগন্যাল দিয়ে ভরে ওঠে। এই সময়েই ভিনগ্রহী সভ্যতা (Alien Civilization) সহজে আমাদের খুঁজে পেতে পারে।
ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা হলো –
-
পৃথিবী থেকে পাঠানো বড় মাপের যোগাযোগ সিগন্যালগুলো পর্যবেক্ষণ করা।
-
মহাশূন্যে কোনো অস্বাভাবিক প্রতিফলন বা প্রতিক্রিয়া ধরা পড়ছে কি না দেখা।
-
এমনকি পৃথিবীর আকাশপানে তাকানো শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে সম্ভাব্য ভিনগ্রহী (Alien) “রিপ্লাই” খোঁজা।
উপসংহার
নাসার সাম্প্রতিক গবেষণা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে এক নতুন বাস্তবতার সামনে। হয়তো আমরা এখনো ভিনগ্রহের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারিনি। তবে নিশ্চিতভাবেই আমাদের বার্তা আর গোপন নয়। কে জানে, হয়তো এই মুহূর্তেই কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সির সভ্যতা আমাদের মহাকাশযানের সঙ্গে পাঠানো কমান্ড শুনছে! তাই ভিনগ্রহী (Alien) জীব খোঁজার ক্ষেত্রে এই চিন্তাধারা ভবিষ্যতে যুগান্তকারী মোড় এনে দিতে পারে।
এরকম আরও খবর পড়তে দেখুন বুলেটিন বাংলা