বাবা লোকনাথের (Loknath) হিমালয়ে সিদ্ধিলাভ, ব্রহ্মদর্শন ও বিশ্বপর্যটন
লোকনাথ (Loknath) বাবার হিমালয়ে পদার্পণ
দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়, পর্বত, আর ঘন বন পেরিয়ে গুরু ভগবান গাঙ্গুলি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে পৌঁছলেন হিমালয়ের বদ্রীনাথে। এখান থেকে দৃশ্যমান তুষারাবৃত হিমালয়ের শিখর। তাঁদের লক্ষ্য ছিল সেই বরফমণ্ডিত শৃঙ্গে পৌঁছানো। প্রথমে গুরুদেব শিষ্যদের সঙ্গে বদ্রীনারায়ণের দর্শন করলেন। এরপর হিমালয়ের খাড়া পথ ধরে বনের মধ্য দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করলেন। আরোহণের সময় তাঁদের মনে হচ্ছিল, এই পবিত্র ভূমিতে পূর্বে অসংখ্য যোগী সিদ্ধিলাভ করেছেন। হিমালয় যোগীদের পবিত্র তীর্থ। সূর্যাস্তের সময় হিমালয়ের বরফাচ্ছাদিত শিখরে অস্তরাগের ছোঁয়ায় অপরূপ দৃশ্য ফুটে উঠল। গুরুদেব শিষ্যদের সঙ্গে এই অপূর্ব রূপ দেখে এগিয়ে চললেন।
বরফাচ্ছন্ন অঞ্চলে পৌঁছে লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধব মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন হিমালয়ের শৃঙ্গের দিকে। চারপাশে শুধু বরফ, মাঝে মধ্যে গুহা। নির্জন, নিস্তব্ধ পরিবেশ। হঠাৎ এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধতা ভেদ করল—‘বাবা লোকনাথ (Baba Loknath), বাবা বেণীমাধব!’ নিজেদের নাম শুনে তারা বিস্মিত হলেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন, এক গুহার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন জটাজুটধারী দুই যোগী। তাঁদের দেহ থেকে দীপ্ত আভা নির্গত হচ্ছে, যা গুহার প্রবেশপথকে আলোকিত করেছে। গুরুদেব বুঝলেন, এই সিদ্ধযোগীরা লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধবের প্রতি কৃপা করতে এসেছেন। তিনি শিষ্যদের ইঙ্গিতে তাঁদের কাছে যেতে বললেন। লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধব গুরুদেবকে প্রণাম করে ভক্তিভরে সিদ্ধযোগীদের প্রণাম করলেন। যোগীরা তাঁদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে গুহার ভেতরে নিয়ে গেলেন। গুরুদেবও তাঁদের সঙ্গে গুহায় প্রবেশ করলেন।
গুহায় যোগসাধনা ও সিদ্ধিলাভ
সিদ্ধযোগীরা লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধবকে বললেন, “আমরা তোমাদের ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য যোগের ক্রিয়া শেখাব।” এরপর হিমালয়ের বরফমণ্ডিত গুহায় শুরু হল অবিরাম যোগশিক্ষা। শিষ্যরা একজন যোগীকে ‘বড়ঠাকুর’ ও অপরজনকে ‘ছোটঠাকুর’ বলে সম্বোধন করতেন। গুরু ভগবান গাঙ্গুলির শিক্ষায় তারা অষ্টাঙ্গ যোগে পারদর্শী হয়েছিলেন এবং অষ্টাদশ সিদ্ধির অনেকগুলি লাভ করেছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মদর্শনের জন্য প্রয়োজন ছিল আরও উৎকর্ষ। এর জন্য তুষারাবৃত হিমালয়ে কঠোর যোগসাধনা ও কৃচ্ছুব্রত পালন অপরিহার্য। দেহের ইন্দ্রিয় ও সত্তাকে জয় করে আত্মাকে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত করতে হবে। সিদ্ধযোগীরা তাঁদের উচ্চমার্গের যোগক্রিয়া শিখিয়ে বললেন, “তোমাদের দেহে রক্ত থাকবে না, তা সাদা রসে পরিণত হবে। ভয় পেও না। পঞ্চভূতের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করো। ব্রহ্মদর্শন না হওয়া পর্যন্ত কঠোর সাধনা চালিয়ে যাও।” শিক্ষা দিয়ে যোগীরা বিদায় নিলেন।
লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধব কঠোর যোগসাধনা শুরু করলেন। তুষারাবৃত হিমালয়ে দিগম্বর রূপে সাধনা চলতে থাকল। কখনও ফলমূল, কখনও কন্দমূল গ্রহণ করতেন, বেশিরভাগ দিন অনাহারে কাটত। তাঁদের দেহ বরফে ঢেকে যেত, আবার তা গলে যেত, কিন্তু সমাধি অটুট থাকত। গুরুদেব তাঁদের সাধনা প্রত্যক্ষ করতেন। ক্রমে তাঁদের দেহে উজ্জ্বল আভা দেখা গেল। গুরুদেব বুঝলেন, শিষ্যরা সিদ্ধিলাভের পথে। প্রায় ৫০ বছরের কঠোর সাধনার পর তাঁরা ব্রহ্মদর্শন লাভ করলেন। নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে পরমাত্মার সঙ্গে একাত্ম হলেন। তাঁদের দেহ থেকে জ্যোতিরাশি নির্গত হতে লাগল। ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে তাঁরা মুক্তির পথে এগিয়ে গেলেন।
লোকনাথের (Loknath) ব্রহ্মজ্ঞানের তাৎপর্য
ব্রহ্মানন্দ ভারতী বাবা লোকনাথকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ব্রহ্মজ্ঞান লাভের অর্থ কী?” বাবা বললেন, “আমার দেহ ও কর্ম আছে, আর কিছু চাই না। কর্মক্ষয় হলে আমি একক থাকব, তাই চাই।” ব্রহ্মানন্দ ভারতী আবার প্রশ্ন করলেন, “বাহ্যজগতের যে অংশের সঙ্গে আপনার সংস্রব নেই, তাকে কীভাবে আপনার কর্ম বলব?” বাবা উত্তর দিলেন, “যা আমার গোচর নয়, তা আছে বলে আমার ধারণা নেই।” তিনি বললেন, “যখন কোনো বিষয়ে প্রবৃত্ত হতে হবে না, তখন কর্মক্ষয় হয়েছে বুঝব। তখন আমি মুক্ত হব।” ব্রহ্মজ্ঞান হল নিজ আত্মাকে পরমাত্মার অংশ হিসেবে উপলব্ধি করা, যেখানে জগৎ ও পরমাত্মার মধ্যে কোনো ভেদ থাকে না। এই জ্ঞানে দেহ দিব্যজ্যোতি লাভ করে, যোগী পরমাত্মার সঙ্গে লীন হন।
সন্ন্যাসদীক্ষা
এক শুভ মুহূর্তে গুরুদেব লোকনাথকে সন্ন্যাসাশ্রমে দীক্ষা দিলেন। তাঁর নতুন নাম হল ‘লোকনাথ ব্রহ্মচারী’ (Loknath Brahmachari)। এই নাম শুধু উপাধি নয়, অথর্ববেদে বর্ণিত ব্রহ্মচারীর মাহাত্ম্যের প্রতিফলন। ব্রহ্মচারী হলেন তিনি, যিনি ব্রহ্মে বিচরণ করেন, তপস্যায় পৃথিবী ও দ্যুলোক পোষণ করেন। লোকনাথের যোগৈশ্বর্য এই নামের মাধ্যমে প্রকাশিত হল। গুরুদেব বললেন, “তুমি মহাযোগী হয়েছ, এখন ব্রহ্মজ্ঞানের আলোয় জগৎকে আলোকিত করতে হবে। লোকশিক্ষার মাধ্যমে জীবের মুক্তির পথ দেখাতে হবে।”
কাবুলে কোরান শিক্ষা
গুরুদেব শিষ্যদের কোরান শিক্ষার জন্য কাবুলে নিয়ে গেলেন। সেখানে পারসিক কবি মোল্লাসাদীর কাছে তাঁরা ইসলাম ধর্মের মূলতত্ত্ব শিখলেন। মোল্লাসাদী, একজন জ্ঞানমার্গের সাধক, তাঁদের আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলেন। এক বছর শিক্ষার পর গুরুদেব নিশ্চিত হলেন, শিষ্যরা লোকশিক্ষার জন্য প্রস্তুত। তিনি তাঁদের কাশীধামে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
কাশীধামে মহাযোগানুষ্ঠান
কাশীধামে পৌঁছে গুরুদেব বললেন, “কাশী ভগবান শঙ্করের রাজধানী। এখানে আমি দেহত্যাগ করব। তোমরা মহাযোগী হিতলাল মিশ্রের কাছে যোগের গুহ্যতত্ত্ব শিখবে।” হিতলাল মিশ্র, যিনি তৈলঙ্গস্বামী নামে পরিচিত, কাশীর মণিকর্ণিকা ঘাটে ছিলেন। গুরুদেব তাঁর শিষ্যদের তৈলঙ্গস্বামীর হাতে সমর্পণ করে যোগাসনে দেহত্যাগ করলেন। লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধব গুরুর শেষকৃত্য সম্পন্ন করলেন। তৈলঙ্গস্বামীর কাছে তাঁরা যোগের গুহ্যতত্ত্ব শিখে ব্রহ্মজ্ঞ হলেন। তাঁদের দেহে দিব্যজ্যোতি প্রকাশিত হল। তৈলঙ্গস্বামী বুঝলেন, তাঁরা পরিব্রাজনের জন্য প্রস্তুত।
মক্কা যাত্রা
লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধব মক্কায় পৌঁছে ইসলাম ধর্মের জ্ঞান অর্জন করলেন। মদিনায় ধর্মালোচনার পর তাঁরা মক্কেশ্বরে সাধক আব্দুল গফুরের সান্নিধ্যে গেলেন। আব্দুল গফুর মৌনব্রতী ছিলেন। লোকনাথ (Loknath) তাঁর সামনে ধ্যানে বসলেন। কয়েক দিনের পরীক্ষার পর আব্দুল গফুর লোকনাথের ব্রহ্মজ্ঞানের পরিচয় পেলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কয়দিনের লোক?” লোকনাথ (Loknath) বললেন, “আমি দুই দিনের। আপনি কয়দিনের?” আব্দুল গফুর উত্তর দিলেন, “আমি চারিদিনের।” এই কথোপকথনের মাধ্যমে তাঁদের আধ্যাত্মিক বন্ধন গড়ে উঠল। লোকনাথ (Loknath) ব্রহ্মজ্ঞানের আলোয় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তা দিলেন, যা সকলকে মুগ্ধ করল।
ইউরোপ পর্যটন
মক্কেশ্বর থেকে লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধব তুরস্ক, গ্রিস, ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্স ভ্রমণ করলেন। গ্রিসে তাঁরা পণ্ডিত ও সাধুদের সঙ্গে আধ্যাত্মিক আলোচনা করলেন। ইতালি ও ফ্রান্সে ধর্মানুরাগীদের মন জয় করলেন। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও জ্ঞান অর্জন করে তাঁরা স্বদেশে ফিরলেন।
উত্তরমেরু অভিযান
হিমালয়ে ফিরে লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধব গঙ্গার তটে মুনি-ঋষিদের সঙ্গে আধ্যাত্মিক আলোচনা করলেন। বদ্রীনাথ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী দর্শনের পর তাঁরা উত্তরমেরু অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন। তৈলঙ্গস্বামী ও আব্দুল গফুর তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন। তিন বছর প্রস্তুতির পর চার মহাযোগী উত্তরমেরুর পথে রওনা হলেন। দুর্গম পথে পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথ ধরে তাঁরা এগিয়ে গেলেন। দশ বছরের অভিযানে তাঁরা সুমেরু শৃঙ্গের কাছাকাছি পৌঁছলেন, কিন্তু পাতালের পথে না গিয়ে ফিরে এলেন।
চীনদেশ যাত্রা
সুমেরু অভিযানের পর তৈলঙ্গস্বামী লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধবকে চীনদেশ যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া হয়ে তাঁরা চীনে পৌঁছলেন। তাঁদের যোগীসুলভ রূপে চীনবাসী মুগ্ধ হল। ভাষার সমস্যা সত্ত্বেও তাঁরা আধ্যাত্মিক ভাব বিনিময় করলেন। রাজার কারাগারে কিছুদিন থাকার পর তাঁরা মুক্তি পেলেন। চীনবাসী তাঁদের সমাদর করল। তৈলঙ্গস্বামী বললেন, “এবার স্বদেশে ফিরে লোকশিক্ষার কাজ করো।” লোকনাথ (Loknath) ও বেণীমাধব স্বদেশে ফিরে সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত হলেন।
তথ্যসূত্রঃ- অজানা মহাযোগী বাবা লোকনাথ – ডঃ অসীমবরণ দে
আরও খবর পড়ুনঃ এখানে ক্লিক করে