যীশুর (Jesus) জীবনের ১০টি অজানা তথ্য
যীশু খ্রিস্টের জীবনের এমন কিছু তথ্য রয়েছে যা হয়তো অনেকেই জানেন না। এখানে আমরা যীশুর জীবন সম্পর্কে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ও চমকপ্রদ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।

১. যীশুর (Jesus) ভাই-বোন ছিল
বাইবেলের মধ্যে উল্লেখ রয়েছে যে যীশুর চার ভাই ছিল: জেমস, যোসেস, জুড এবং সাইমন। এছাড়া তাঁর কমপক্ষে দুই বোনও ছিল, যদিও তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যীশুর ভাই-বোনেরা প্রথমে তাঁর উপর বিশ্বাস রাখতেন না। এমনকি তাঁরা একবার পরামর্শ দিয়েছিলেন যে যীশু যেন আরও বড় শহরে যান, কারণ একজন জনসাধারণের ব্যক্তিত্ব গোপনে কাজ করতে পারেন না।
তবে যীশুর এই ভাই-বোনদের পরিচয় নিয়ে খ্রিস্টানদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এরা মেরি ও যোসেফের সন্তান, যারা যীশুর জন্মের পর স্বাভাবিক উপায়ে জন্মগ্রহণ করেছিল। অন্যদিকে, অনেকেই মনে করেন মেরি সারা জীবন কুমারী ছিলেন, তাই “ভাই” এবং “বোন” শব্দগুলো যীশুর কাজিন বা যোসেফের আগের বিয়ের সন্তানদের বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে।
২. শৈশবে যীশু (Jesus) হারিয়ে গিয়েছিলেন
যীশু যখন ১২ বছর বয়সী ছিলেন, তখন একটি ঘটনা ঘটে যা তাঁর শৈশবের একমাত্র উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে একটি। পাসওভার উৎসব উপলক্ষে মেরি ও যোসেফ যীশুকে নিয়ে জেরুজালেমে গিয়েছিলেন। বাড়ি ফেরার পথে তাঁরা বুঝতে পারেন যীশু তাদের সঙ্গে নেই।
তিন দিন ধরে তাঁরা জেরুজালেমে খোঁজাখুঁজি করার পর অবশেষে যীশুকে মন্দিরে খুঁজে পান। সেখানে যীশু শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন এবং প্রশ্ন করছিলেন। যখন মেরি তাঁকে বকাবকি করেন, যীশু শান্তভাবে বলেন যে তিনি তাঁর পিতার বাড়িতে আছেন। তাঁর জ্ঞানের গভীরতায় সবাই অবাক হয়ে যান।
৩. সব প্রেরিতকে যীশু (Jesus) নিজে নির্বাচন করেননি
যীশুর বারোজন প্রধান অনুসারী বা প্রেরিত ছিলেন। তবে তাঁদের মধ্যে একজন, মাত্থিয়াস, যীশুর দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত হননি।যীশুর মৃত্যু ও পুনরুত্থানের পর, যুদাস ইস্কারিয়টের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে প্রেরিতদের মধ্যে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। বাকিরা একত্রিত হয়ে প্রার্থনা করেন এবং লটারির মাধ্যমে দুই প্রার্থীর মধ্যে একজনকে নির্বাচন করেন। মাত্থিয়াস এই পদ্ধতিতে নির্বাচিত হন এবং তিনিই একমাত্র প্রেরিত যাঁকে যীশু নিজে বেছে নেননি।
৪. যীশু (Jesus) ছিলেন বাস্তব এক ঐতিহাসিক চরিত্র
ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে, ইতিহাসবিদরা একমত যে যীশু বাস্তব চরিত্র ছিলেন। তাঁর জন ব্যাপটিস্টের মাধ্যমে বাপ্তিস্ম নেওয়া এবং রোমান শাসনে ক্রুশবিদ্ধ হওয়া দুইটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত।
যীশু সম্পূর্ণ কাল্পনিক ছিলেন বলে যে তত্ত্বটি পরিচিত, তা মূলধারার ইতিহাসবিদদের দ্বারা গৃহীত নয়। এমনকি খ্রিস্টান বাইবেলের বাইরের লেখাগুলিতেও যীশুর উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন প্রথম শতাব্দীর ঐতিহাসিক যোসেফাস এবং ট্যাসিটাস-এর রচনায়। এছাড়া “বিব্রত অবস্থার মাপকাঠি” তত্ত্বটি বলে যে, যীশুর জীবনের কিছু ঘটনা, যেমন তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া, তাঁকে মহিমান্বিত করার জন্য উদ্ভাবিত হতে পারে না।
৫. যীশু (Jesus) পুরোনো নিয়মে (ওল্ড টেস্টামেন্টে) উপস্থিত হতে পারেন
অনেক ধর্মতত্ত্ববিদ মনে করেন, যীশু পুরোনো নিয়মে “প্রভুর দেবদূত” নামে উল্লেখিত ছিলেন। এই দেবদূত প্রধান ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে দেখা করতেন এবং অনেক সময় ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব করতেন।
অনেকে মনে করেন, এটি যীশুর মানব রূপ গ্রহণের আগের প্রকাশ হতে পারে। পুরোনো নিয়মে এই দেবদূতের উপস্থিতি দেখা গেলেও, নতুন নিয়মে (নিউ টেস্টামেন্টে) তাঁর আর কোনও উল্লেখ নেই। সম্ভবত, যীশু তখন মানব রূপে পৃথিবীতে উপস্থিত হয়েছিলেন।

৬. নাজারেথ ছিল একটি সাধারণ গ্রাম
যখন কেউ “নাজারেথের যীশু” নামটি শোনে, এটি এখন একটি বিশেষণ মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময়, নাজারেথ ছিল একটি ক্ষুদ্র ও সাধারণ গ্রাম।বাইবেলে নাথানিয়েল নামে একজন বলেছিলেন, “নাজারেথ থেকে কি ভালো কিছু আসতে পারে?” আজকের নাজারেল হল ইজরায়েলের আরব সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল এবং একটি ব্যস্ত স্থান-ও বটে!
৭. “ক্রাইস্ট” ছিল না যীশুর (Jesus) পদবি
অনেকে মনে করেন “যীশু ক্রাইস্ট” নামে “ক্রাইস্ট” তাঁর পদবি। কিন্তু এটি আসলে একটি উপাধি। “ক্রাইস্ট” শব্দটি গ্রিক ভাষার “খ্রিস্টোস” থেকে এসেছে, যার অর্থ “অভিষিক্ত” বা “বেছে নেওয়া ব্যক্তি”।তৎকালীন সময়ে, লোকেরা তাঁদের পিতার নাম বা শহরের নাম দিয়ে পরিচিত হতেন। তাই যীশুকে কখনও “নাজারেথের যীশু” বা “যোসেফের পুত্র যীশু” বলা হতো।
৮. যীশুর (Jesus) পরিবার ছিল অপূর্ণ
অনেকেই মনে করেন, যীশু এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যেখানে কোনও সমস্যা ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।যীশু যখন ভিড়ের সামনে কথা বলছিলেন, তখন তাঁর পরিবার ভীত হয়ে তাঁকে টেনে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, এটা ভেবে যে তিনি “পাগল হয়ে গেছেন”।এছাড়া যীশুর পরিবারবৃত্তান্তে কিছু বিতর্কিত চরিত্রও পাওয়া যায়, যেমন দেহপসারিণী, ব্যভিচারী এবং ষড়যন্ত্রকারী। এটি বাইবেলের একটি বার্তা বহন করে যে ঈশ্বর অপূর্ণ মানুষের মাধ্যমেও তাঁর উদ্দেশ্য পূরণ করেন।
৯. যীশু (Jesus) একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারতেন
যীশুর প্রধান ভাষা ছিল আরামিক, যা প্রথম শতাব্দীতে ইহুদিদের মধ্যে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হতো। তিনি হিব্রু ভাষা বুঝতেন, যা ধর্মীয় লেখায় ব্যবহৃত হতো।এছাড়া, অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, যীশু গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষাও জানতেন। গ্রিক ভাষা ছিল আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের শাসনের সময় থেকে অঞ্চলে প্রচলিত। আর ল্যাটিন ভাষা রোমান সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতো।
১০. ক্রুশবিদ্ধকরণের সময় মেরি উপস্থিত ছিলেন
যীশুর ক্রুশবিদ্ধকরণের গল্প বেশিরভাগ মানুষ জানেন। তবে অনেকেই জানেন না যে তাঁর মা মেরি সেই সময় উপস্থিত ছিলেন।বাইবেলের যোহনের (১৯:২৫–২৭) উল্লেখ অনুযায়ী, যীশু ক্রুশে ঝুলন্ত অবস্থায় মেরিকে যোহনের দায়িত্বে দিয়ে বলেন, “মহিলা, এই তোমার পুত্র।” এবং যোহনকে বলেন, “এই তোমার মা।” সেই মুহূর্ত থেকে যোহন মেরিকে নিজের মায়ের মতো দেখাশোনা করতে থাকেন।
এই ১০টি তথ্য যীশুর জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। এটি তাঁর মানবিক, ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক দিক সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে সাহায্য করে।
আরও খবর